ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে শরিয়াহ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এক নারীকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। টিকটক লাইভে স্বামীর বাইরে এক পুরুষের সঙ্গে চুম্বনের অভিযোগে দণ্ডিত হওয়া ওই নারী শাস্তি চলাকালে অচেতন হয়ে পড়েন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘটিত এমন অভিযোগে এটি আচেহে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের প্রথম ঘটনা।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ওই নারী ও তাঁর সঙ্গীকে টিকটক লাইভস্ট্রিমে চুম্বন করতে দেখা গেলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে তদন্ত শেষে শরিয়াহ আদালতের নির্দেশে ওই নারীকে ২১টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়। তবে তিনি কতটি আঘাত পাওয়ার পর অচেতন হন, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ওই নারীর পিঠে মুখোশধারী শরিয়াহ পুলিশের সদস্য বারবার বেতের আঘাত করছেন। প্রতিটি আঘাতে তিনি যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে চিকিৎসাকর্মীরা তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও বাকি শাস্তি পরে সুস্থ হওয়ার পর কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
একই ঘটনায় ওই নারীর সঙ্গীকেও বেত্রাঘাত করা হয়েছে। একই দিনে আরও চারজন দণ্ডিত ব্যক্তি বিভিন্ন অভিযোগে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের শাস্তি পান। এ ছাড়া অপর এক যুগলকে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে ২৭টি করে বেত্রাঘাত এবং জুয়া খেলার দায়ে দুই ব্যক্তিকে যথাক্রমে ২৯ ও ৮টি বেত্রাঘাত করা হয়।
আচেহ শরিয়াহ পুলিশের প্রধান মুহাম্মদ রিজাল সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ইসলামি শরিয়াহ আইন স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরিয়াহ আইন ভঙ্গের ঘটনায় এই ধরনের শাস্তি এই প্রথম কার্যকর হলো।
ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র প্রদেশ হিসেবে আচেহে শরিয়াহ আইনের বিশেষ সংস্করণ কার্যকর রয়েছে। সেখানে বিবাহবহির্ভূত নারী-পুরুষের চুম্বন, আলিঙ্গন বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নিষিদ্ধ। জুয়া, মদ্যপান, সমকামী সম্পর্ক ও বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মতো অপরাধেও প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের শাস্তির তীব্র সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্দোনেশিয়ার মুখপাত্র হায়েরিল হালিম একে ‘ভয়াবহ বৈষম্যমূলক’ শাস্তি বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, আচেহর শরিয়াহ ফৌজদারি বিধি এখন ডিজিটাল পরিসরেও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ইন্দোনেশিয়ার সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। তাদের মতে, এই ধরনের শাস্তি নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অপমানজনক এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্যাতনের শামিল।
অন্যদিকে আচেহর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত অপরাধ দমনে কার্যকর প্রতিরোধ এবং প্রদেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। যদিও সমালোচকদের মতে, এই ধরনের শাস্তি ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।