অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমের ক্যাম্পবেল টাউন এলাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে ৪৭ বছর বয়সী এক প্রবাসী বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ। নিহত দুই সন্তানের বয়স যথাক্রমে ১২ ও ৫ বছর। দুজনেই ‘লার্নিং ডিফিকাল্টি’ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিজম বা বিকাশজনিত সমস্যা) শিশু ছিল বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশকে ফোনকল করে এই হত্যাকাণ্ডের খবর দেন। এরপর দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের ভেতর থেকে অভিযুক্তের ৪৬ বছর বয়সী স্ত্রী এবং দুই শিশুপুত্রের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে।
নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের অ্যাক্টিং সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মরোনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ক্যাম্পবেল টাউনের ওই বাড়িটির ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও সহিংস ছিল। নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা সাধারণের দেখার অযোগ্য। পুলিশ ঘর থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করলেও কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের সন্ধান পায়নি।
অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তাঁর পরিবার প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। পরিবারটির ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে, অভিযুক্ত বাবা নিজে কোনো চাকরি করতেন না, বরং ঘরে থেকে তাঁর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দুই সন্তানের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতেন। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী বাইরে চাকরি করতেন এবং তিনিই ছিলেন পরিবারের মূল উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক ‘পারিবারিক সহিংসতা জনিত হত্যা’ মামলা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ক্যাম্পবেল টাউন আদালতে তাঁর আইনজীবী জাওয়াদ হোসাইন মক্কেলের পক্ষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করেন।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আইনজীবী জাওয়াদ হোসাইন বলেন, ‘এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক একটি ঘটনা। লকআপে আমার মক্কেল সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।’ তবে অভিযুক্তের পারিবারিক সহিংসতার কোনো পূর্ব ইতিহাস, মাদকের আসক্তি বা মানসিক কোনো অসুস্থতা ছিল কি না, সে বিষয়ে আইনজীবী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, এর আগে এই পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পারিবারিক সহিংসতা বা অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ নেই। এমনকি সমাজকল্যাণ বা শিশু সুরক্ষা বিভাগের সঙ্গেও এই পরিবারের আগের কোনো সংযোগ ছিল না।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পুরো ক্যাম্পবেল টাউন এলাকায় গভীর শোক ও স্তব্ধতা নেমে এসেছে। এক প্রতিবেশী অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাচ্চা দুটোকে প্রায়ই বাইরে হাসিমুখে খেলাধুলা করতে দেখতাম। তারা তো একেবারেই নিষ্পাপ শিশু ছিল! কীভাবে কেউ এমন কাজ করতে পারে?’
অন্য এক প্রতিবেশী বলেন, ‘নিজের এলাকায় যখন এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, তখন বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে যায়। আমি স্তব্ধ।’ স্থানীয় অনেক বাসিন্দা নিহতের বাড়ির সামনে ফুল রেখে শ্রদ্ধা ও শোক জ্ঞাপন করছেন।
এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় ক্ষোভ ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের প্রিমিয়ার (মুখ্যমন্ত্রী) ক্রিস মিনস। তিনি বলেন, ‘এই নারকীয় ঘটনায় সাধারণ মানুষ যেভাবে ক্ষুব্ধ ও বিধ্বস্ত, আমিও ঠিক একইভাবে গভীরভাবে শোকাহত।’
তিনি আরও জানান, আগামী জুনের প্রদেশের বাজেটে পারিবারিক সহিংসতা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের তহবিল ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি স্বীকার করেন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সম্মুখসারির কর্মীদের জন্য বর্তমান বরাদ্দ এখনো যথেষ্ট নয় এবং সরকার এই খাতের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ প্রদেশজুড়ে পারিবারিক সহিংসতা বিরোধী বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন আমারক’-এর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। এর কয়েক দিনের মাথায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডটি সিডনির প্রবাসী সমাজ তথা পুরো অস্ট্রেলিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী শিশুদের পরিচয় ও সামাজিক সুরক্ষার স্বার্থে আইনি কারণে অভিযুক্ত ও নিহতদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্যসূত্র: সিডনি মর্নিং হেরাল্ড