আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কাবুলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে রাশিয়া। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহের বুধবার মস্কোয় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামের (ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোরাম) এক বৈঠকে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগু এই চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইয়াকুব এটিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৈঠকের পর ইয়াকুব বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আমরা এই পথেই এগিয়ে যেতে চাই।’
এই অগ্রগতি মস্কো ও কাবুলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল এবং পরবর্তী এক দশক মুজাহিদীনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছিল। পরে সেই মুজাহিদীনদের একটি অংশ তালেবান গঠন করে। সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পরও বহু বছর দুই পক্ষের সম্পর্ক বৈরী ছিল। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোপনে তালেবানের বিভিন্ন অংশকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
শোইগু পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন তালেবানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং আফগানিস্তানে নিজেদের ২০ বছরের উপস্থিতির জন্য ‘পূর্ণ দায়’ স্বীকার করে। তালেবানকে বৈধতা দেওয়ার পথে রাশিয়া এর আগেই একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছিল।
এর আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে মস্কো তালেবানকে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে ২০০৩ সাল থেকে বহাল থাকা নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর ক্ষমতা দখল করা তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হয় রাশিয়া।
সেসময় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, তালেবান প্রশাসনকে স্বীকৃতি দিলে দুই দেশের মধ্যে ‘গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা’ আরও জোরদার হবে। তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকী এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করে বলেন, এটি অন্য দেশগুলোর জন্যও ‘একটি ভালো উদাহরণ’ তৈরি করেছে।
ভারতের জন্য রাশিয়া ও তালেবানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনতে পারে। নয়াদিল্লি ঐতিহ্যগতভাবেই মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র। একই সঙ্গে আফগানিস্তানে নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ ও বিনিয়োগ রক্ষার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালেবানের সঙ্গেও যোগাযোগ পুনরায় শুরু করেছে।
তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকী ২০২৫ সালে ভারত সফর করেছিলেন। রাশিয়ার সমর্থন পাওয়া তালেবান সরকার ভারতের জন্য কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদিও ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে এটি আফগানিস্তান পুরোপুরি পাকিস্তান বা চীনের প্রভাববলয়ে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
এ ছাড়া পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তানের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধির যে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ভারতের রয়েছে, এই নতুন পরিস্থিতি সেই প্রচেষ্টাকেও সহায়তা করতে পারে।
রাশিয়া-তালেবান অংশীদারত্ব আফগানিস্তানের ওপর পাকিস্তানের ঐতিহাসিক প্রভাব দুর্বল করে দিতে পারে। এক সময় ইসলামাবাদকে তালেবানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সীমান্ত সংঘর্ষ, জঙ্গি সহিংসতা এবং বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পক্ষের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়েছে।
পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করেছে, তালেবান সরকার পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। অন্যদিকে কাবুল সীমান্ত এলাকায় ইসলামাবাদের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। কাবুল অভিযোগ তোলে, ইসলামাবাদ আফগান ভূখণ্ডে প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে আফগান রাজধানীতে একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন হাসপাতালে বিতর্কিত বোমা হামলার ঘটনাও ছিল।
তালেবান কর্মকর্তাদের দাবি, ওই হামলায় ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। তবে পাকিস্তান বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে। তাদের দাবি, তারা কেবল সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সংশ্লিষ্ট জঙ্গি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল।
এই সংকটের আগে কয়েক মাস ধরেই বিতর্কিত পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্ত ডুরান্ড লাইন সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছিল। সীমান্তের দুই পাশে গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা এবং সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করেছে, তালেবান সরকার পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু কাবুল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উল্টো ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে আফগান সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।