ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোববার (২৫ জানুয়ারি) ৯০ বছর বয়সে মারা গেছেন স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে যাঁদের সাংবাদিকতা গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, মার্ক টালি তাঁদের অন্যতম। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এই সাংবাদিক ভারতকে নিজের ঘর বানিয়েছিলেন এবং বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর সাহসী ও নৈতিক সাংবাদিকতার জন্য।
বিবিসি রেডিওতে প্রচারিত তাঁর প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ বাস্তবতার কথা জানতে পারে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের দেয়াল ভেঙে তিনি যুদ্ধের নির্মমতা, মানবিক বিপর্যয় এবং বাঙালি জনগণের সংগ্রামকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেন—বিবিসির ভাষায় যা ছিল ‘নৈতিক দৃঢ়তা ও বিশ্লেষণী সততার অনন্য উদাহরণ।’
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া মার্ক টালি পড়াশোনা করেন যুক্তরাজ্যের মার্লবোরো কলেজ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি হলে। জীবনের শুরুতে তিনি ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী ছিলেন। পরে সাংবাদিকতাকেই নিজের প্রকৃত কাজ হিসেবে বেছে নেন। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও সংযোগ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
১৯৬৪ সালে তিনি নয়াদিল্লিতে বিবিসিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর শান্ত, সংযত ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনশৈলী শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আস্থার জায়গা তৈরি করে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যখন ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং মানবিক সংকট চরমে পৌঁছায়, তখন টালির প্রতিবেদন ছিল কোটি মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের অন্যতম উৎস।
দিল্লি থেকে রিপোর্ট করলেও তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতা, শরণার্থীদের দুর্দশা এবং বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিশ্বদরবারে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর কাজ শুধু সাংবাদিকতা ছিল না; এটি ছিল তাদের অভিজ্ঞতা ও মুক্তির স্বপ্নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের ‘ফরেন ফ্রেন্ড অব বাংলাদেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। টালি প্রায় দুই দশক নয়াদিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নির্বাচন, বিদ্রোহ, সামাজিক পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় টানাপোড়েন কাভার করেন। তিনি শুধু একজন সংবাদদাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানব অভিজ্ঞতার দলিলকার, সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এবং একটি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।