আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব এখন এক বড়সড় হোঁচটের মুখে পড়েছে। গত মাসে উত্তর মালির কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর কিদাল থেকে রুশ বাহিনীর নাটকীয় প্রত্যাহার মস্কোর জন্য এক অপমানজনক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে বিদ্রোহীদের দমনের জন্য ক্রেমলিন-সমর্থিত ‘আফ্রিকা কর্পস’ (সাবেক ভাগনার গ্রুপ) পাঠানো হয়েছিল, বিদ্রূপ ও টিটকারির মধ্যেই সেই সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, কিদাল থেকে রুশ সেনাদের এই পিছুটান শুধু ভূখণ্ড হারানোই নয়, বরং আফ্রিকার প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে রাশিয়ার ভাবমূর্তির ওপর এক বড় আঘাত।
রোববার (১০ মে) সিএনএন জানিয়েছে, আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং তুয়ারেগ বিদ্রোহী জোটের সম্মিলিত আক্রমণে মালির সেনাবাহিনী ও রুশ বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মরুবেষ্টিত কিদালে অবরুদ্ধ হওয়া এড়াতে ‘আফ্রিকা কর্পস’-এ সেনারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে ‘নিরাপদ প্রস্থানের’ চুক্তি করে শহর ত্যাগ করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে—তুয়ারেগ যোদ্ধারা রুশ সেনাদের কনভয়কে উপহাস করছে। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে রাশিয়ার অর্জিত সেই প্রতীকী বিজয় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। একসময় ওই বিজয়কে সাহেল অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাব হটিয়ে মস্কোর আধিপত্যের প্রমাণ হিসেবে দেখা হতো।
বর্তমানে সামরিক ব্যর্থতার পাশাপাশি মালি সরকার এক চরম রাজনৈতিক সংকটেও পড়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মূল কারিগর ও মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা সম্প্রতি এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী জেএনআইএম এই হত্যার দায় স্বীকার করেছে এবং রাজধানী বামাকো অবরোধের হুমকি দিয়েছে। সামরিক জান্তা রাশিয়ার সহায়তায় দেশবাসীকে নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখন অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।
রাশিয়া মানবাধিকারের শর্ত ছাড়াই নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত কয়েক বছরে আফ্রিকার ৪টি দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়ার এই মডেলটি অত্যন্ত অগভীর। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বা মালিতে রাশিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল খনিজ সম্পদের (সোনা ও হিরা) নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
কিদাল পুনর্দখলের পর তুয়ারেগ বিদ্রোহীরা এখন মালি থেকে সমস্ত রুশ সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মালির সামরিক জান্তা এখন শুধু রাশিয়ার ওপর নির্ভর না করে চীন ও তুরস্কের মতো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার দিকে ঝুঁকছে। তবে মালি, বুর্কিনা ফাসো এবং নাইজার মিলে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ গঠন করলেও নিরাপত্তার জন্য তারা এখনো রাশিয়ার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
এদিকে সর্বশেষ কিদালের আত্মসমর্পণ প্রমাণ করেছে, সিরিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো আফ্রিকাতেও মিত্রদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে পুতিনের শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাহেল অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে রাশিয়ার অপরাজেয় ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন।