বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ঘাতক ব্যাধি হৃদ্রোগ। যে কেউ এর শিকার হতে পারেন। বাংলাদেশেও হৃদ্রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একসময় হৃদ্রোগকে সাধারণত বয়স্ক মানুষের রোগ বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন প্রায় সব বয়সী মানুষই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। আমাদের দেশে ৪০-৫০ বছর এমনকি তার চেয়ে কম বয়সেও অনেকে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
হৃদ্রোগের কারণ
এই রোগের অনেক কারণ আছে। গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো:
- অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণ
- তামাক ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- উচ্চ রক্তচাপ
- ডায়াবেটিস
- কায়িক পরিশ্রমের অভাব
- অতিরিক্ত লবণ ও ট্রান্সফ্যাট খাওয়া
- মানসিক চাপ
হৃদ্রোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। তা ছাড়া কেউ একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারে না। তাই হৃদ্রোগের চিকিৎসার চেয়ে তা প্রতিরোধ করাই উত্তম।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অর্থাৎ সুষম খাবার ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
- অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।
- চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করা অত্যন্ত জরুরি।
- হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ পরিমাপে স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করা যেতে পারে।
- স্মার্টফোনে ব্যায়ামের অ্যাপ ইনস্টল করে তা অনুসরণ করা যেতে পারে।
হৃদ্রোগের লক্ষণ
- বুকে বা বাহুতে ব্যথা হৃদ্রোগের অন্যতম লক্ষণ। এর সঙ্গে চোয়ালের পেছন দিক এবং গলায় চিনচিনে ব্যথা হতে পারে।
- অনেক সময় বুকে জ্বালাপোড়া করাও হৃদ্রোগের অন্যতম লক্ষণ হতে পারে।
- বদহজম, বমি বমি ভাব, অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস হৃদ্রোগের উপসর্গ হতে পারে।
- হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলে ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামা করে। অনেক সময় রোগী ঘামতে থাকেন। এমনটা প্রবল শীতেও হতে পারে।
- হৃদ্রোগ সব সময় হঠাৎ করে হবে এমন নয়। অনেক সময় হৃদ্রোগ ধীরে ধীরে মানুষের হৃদ্যন্ত্রকে ব্লক করে দেয়। এ ধরনের হৃদ্রোগই ‘মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন’ বা হার্ট অ্যাটাক। এ ক্ষেত্রে প্রবল অস্বস্তিকর অনুভূতি অন্যতম লক্ষণ।
- হালকা পরিশ্রম বা সিঁড়ি ব্যবহার করলে বুকে ব্যথা হলে সেটিও হৃদ্রোগের লক্ষণ।
হার্ট অ্যাটাকে করণীয়
- হার্ট অ্যাটাকে তাৎক্ষণিক কিছু কাজ করলে প্রাণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।
- হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসককে দেখাতে হবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া কোনো চিকিৎসা করাতে গেলে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে
- পড়তে পারে।
- হার্ট অ্যাটাকের পরপরই রোগীকে শক্ত জায়গায় হাত-পা ছড়িয়ে শুইয়ে দিন এবং গায়ের জামা-কাপড় ঢিলেঢালা করে দিন।
- আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বাতাস চলাচলের রাস্তাগুলো সব উন্মুক্ত করে দিন। এটি রোগীকে গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে সহায়তা করবে।
- হার্ট অ্যাটাকের পর যদি আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালুর চেষ্টা করতে হবে।
- হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীর যদি বমি আসে তাহলে তাকে একদিকে কাত করে দিন। এতে রোগী সহজেই বমি করতে পারবে।
- হার্ট অ্যাটাকের পর হৃৎপিণ্ডে রক্তের সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বাজারে প্রচলিত ৩০০ মি.গ্রা. ডিসপ্রিন (অ্যাসপিরিন), ৩০০ মি.গ্রা. ক্লোপিডোগ্রেল, ৪০ মি.গ্রা. অ্যার্টভাস্টাটিন এবং ৪০ মি.গ্রা. ওমিপ্রাজল খাইয়ে দ্রুত
- হৃদ্রোগ হাসপাতালে পৌঁছে দিন। সেখানে কার্ডিওলজিস্ট দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজনে জরুরি এনজিওপ্লাস্টিসহ অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, মিরপুর, ঢাকা