বিশ ও একুশ শতকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অকল্পনীয় উন্নতি সত্ত্বেও একটি সাধারণ অভ্যাস এখনো প্রাণ বাঁচানোর কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত। সেটি হলো ‘হাত ধোয়া’। ৫ মে ছিল ‘বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস’। ‘পদক্ষেপই জীবন বাঁচায়—নিরাপদ চিকিৎসা পরিচ্ছন্ন হাত থেকে শুরু হয়’ প্রতিপাদ্যে প্রতিবছরের মতো এ বছরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিনটি পালন করে। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পরিচ্ছন্ন হাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
» হাত ধোয়ার অভ্যাস: আধুনিক চিকিৎসার সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর ওষুধ
» সুরক্ষিত হাত, সুস্থ জীবন: বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার
এই ধারণা ঐতিহাসিকভাবে খুব বেশি পুরোনো নয়। উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগনাজ সেমেলওয়াইস প্রথম লক্ষ করেন, চিকিৎসকেরা ব্যবচ্ছেদ কক্ষ থেকে সরাসরি প্রসূতি বিভাগে গিয়ে রোগী দেখার কারণে সংক্রমণের হার বেড়ে যাচ্ছে। তিনি সাবান বা ক্লোরিন দিয়ে হাত ধোয়ার নিয়ম চালু করেন। এ ঘটনা নাটকীয়ভাবে মৃত্যুর হার কমিয়ে দেয়।
পরে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এবং লুই পাস্তুরের গবেষণায় হাত পরিচ্ছন্নতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫ মে ‘বিশ্ব হাত পরিচ্ছন্নতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আমাদের হাত প্রতিদিন অসংখ্য বস্তুর সংস্পর্শে আসে, যা কয়েক কোটি জীবাণুর আবাসস্থল হতে পারে। এ কারণে হাত পরিচ্ছন্ন রাখার সুনির্দিষ্ট
» সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯-এর মতো শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে এটি প্রধান ঢাল।
» অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ: মানুষ কম অসুস্থ হলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন কমে যায়, ফলে সুপারবাগের উত্থান রোধ করা সম্ভব হয়।
» হাসপাতালজনিত সংক্রমণ রোধ: সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীদের নতুন সংক্রমণের আশঙ্কা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
» রোগী স্পর্শ করার আগে: বাইরের জীবাণু যাতে রোগীর শরীরে প্রবেশ না করে।
» জীবাণুমুক্তকরণের আগে: কোনো ক্ষতে ড্রেসিং বা ইনজেকশন দেওয়ার আগে।
» শরীরের তরল সংস্পর্শের ঝুঁকির পরে: রক্ত, লালা বা প্রস্রাবের সংস্পর্শে আসার পর।
» রোগীকে স্পর্শ করার পরে: রোগীর গা থেকে জীবাণু যাতে অন্য কোথাও না ছড়ায়।
» রোগীর চারপাশের পরিবেশ স্পর্শ করার পরে: রোগীর বিছানা, ট্রলি বা আসবাব ছোঁয়ার পর।
শুধু হাতে পানি ঢাললেই জীবাণুমুক্ত হয়ে যায় না। কার্যকরভাবে হাত পরিষ্কার করতে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হয়। এ জন্য যা করবেন—
» হাত ভিজিয়ে নিন: পর্যাপ্ত সাবান-পানি দিয়ে।
» তালু ঘষা: দুই হাতের তালু একে অপরের ওপর রেখে ঘষুন।
» পিঠ ঘষা: বাঁ হাতের পিঠের ওপর ডান হাতের তালু দিয়ে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ঘষুন। তারপর উল্টো হাতও একইভাবে ঘষুন।
» আঙুলের ফাঁক: দুই তালু সামনাসামনি রেখে আঙুলের ফাঁকে ঘষুন।
» আঙুলের উল্টো পিঠ: আঙুলের গিঁটগুলো এক হাতের তালুর সঙ্গে অন্য হাত দিয়ে ঘষুন।
» বৃদ্ধাঙ্গুলি: বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিষ্কার করুন।
» নখ ও আঙুলের ডগা: ডান হাতের আঙুলের ডগাগুলো বাঁ হাতের তালুতে রেখে বৃত্তাকারে ঘষুন।
» খাবার তৈরি করার আগে এবং খাওয়ার আগে হাত ধোয়া।
» টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা।
» বাইরে থাকাকালীন চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
» ছোটবেলা থেকে শিশুদের হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম শেখানো।
» নিজের সঙ্গে সব সময় ছোট একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা।
আমাদের হাত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এটিই হতে পারে রোগের বাহক। মূলত আপনার হাতের পরিচ্ছন্নতা, আপনার ও আপনার প্রিয়জনের সুরক্ষা। পরিচ্ছন্ন হাত কেবল অভ্যাসের বিষয় নয়, এটি একটি দায়িত্ব।
ডা. কাকলী হালদার
সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ,ঢাকা মেডিকেল কলেজ