দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশেষ জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি। এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের তৃতীয় ধাপে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে হাম শনাক্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১৭। এর মধ্যে ৩৬ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং ১৮১ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এই সংকটকালে সংক্রমণ দ্রুত রোধ করতে আজ বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সকাল সোয়া ৮টায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জিন্দা পার্কের ‘লিটল অ্যাঞ্জেল সেমিনারি’তে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন।
টিকাদান কর্মসূচির সময়সূচি ও ব্যাপকতা
ইপিআইর (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ গতকাল জানিয়েছেন, আগামী চার সপ্তাহ (শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত) প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত দেশজুড়ে এই কর্মসূচি চলবে।
ক্যাম্পেইনের ব্যাপ্তি: সিটি করপোরেশন এলাকায় এই বিশেষ কার্যক্রম ২০ মে পর্যন্ত এবং দেশের অন্যান্য স্থানে ১২ মে পর্যন্ত চলবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পরিকল্পনা: নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা ও শিশু আশ্রমে অধ্যয়নরত পাঁচ বছরের কম বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সেখানে গিয়েই টিকা দেওয়া হবে।
স্থায়ী ও অস্থায়ী কেন্দ্র: প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের হাসপাতাল এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্থায়ী কেন্দ্র পরিচালিত হবে। ক্যাম্পেইন চলাকালীন এসব কেন্দ্র থেকে শিশুদের রুটিন টিকাও গ্রহণ করা যাবে।
বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক পরিসংখ্যান (৫-১৯ এপ্রিল)
সরকার ইতিমধ্যে দুই দফায় ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৩ জন শিশুকে সফলভাবে টিকা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী বিভাগভিত্তিক চিত্র:
ঢাকা বিভাগ: ৬ লাখ ১৩৪ জন।
রাজশাহী বিভাগ: ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৭৪৩ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগ: ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৮ জন।
ময়মনসিংহ বিভাগ: ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৮৯ জন।
বরিশাল বিভাগ: ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৩ জন।
খুলনা বিভাগ: ৭৪ হাজারে ৫৮৫ জন।
এদিকে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ চারটি প্রধান সিটি কর্পোরেশনে ৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩৮ জন শিশুকে টিকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫১ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা উত্তরে ২ লাখ ৪৪ হাজার এবং দক্ষিণে ১ লাখ ৮৮ হাজার শিশু এই সুরক্ষা পেয়েছে।
অভিভাবকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
চিকিৎসকেরা বলছেন, শুধু হামের কারণে মৃত্যুর রেকর্ড নেই; যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের হামের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য জটিলতাও রয়েছে। তাই সচেতনতা জরুরি:
১. অসুস্থতা ও টিকা: যেসব শিশুর বর্তমানে জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দিতে হবে।
২. ডোজের ব্যবধান: যদি কোনো শিশু সম্প্রতি হামের নিয়মিত ডোজ নিয়ে থাকে এবং তার বয়স চার সপ্তাহ পূর্ণ না হয়, তবে তাকে এই বিশেষ টিকা থেকে বিরত থাকতে হবে। চার সপ্তাহ পার হওয়ার পর টিকা নেওয়া যাবে।
৩. পূর্ববর্তী ইতিহাস: শিশু আগে হামের টিকা পেয়ে থাকলেও বর্তমান ক্যাম্পেইনের বয়সসীমায় থাকলে তাকে অবশ্যই আরও এক ডোজ টিকা নিতে হবে।
৪. আতঙ্ক নয়, সতর্কতা: হামের লক্ষণ (জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে দানা) দেখা দিলে কবিরাজি বা অপচিকিৎসা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৫. পুষ্টি: শিশুকে টিকার পাশাপাশি ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার ও প্রচুর তরল খাবার নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
ইপিআই জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার জন্য অতিরিক্ত কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে: দোকান, বাজার, কারখানা বা চাল কল এলাকায় কাজ করা মায়েদের সাথে থাকা শিশু; বেদে বহর, পথশিশু এবং বস্তির শিশু; হাসপাতাল বা জেলখানায় মায়েদের সাথে থাকা শিশু। এসব শিশুর জন্য তাদের সুবিধামতো সময়ে (বিকেলে বা রাতে) টিকা দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি (১৯ এপ্রিল পর্যন্ত)
শনাক্ত রোগী: ৩ হাজার ৪৪৩ জন।
হাসপাতালে আসা মোট রোগী (উপসর্গসহ): ২৩ হাজার ৬০৬ জন।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে : ১২ হাজার ৩৯৬ জন।
মোট মৃত্যু: ২১৭ জন।