আমাদের বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে গ্রীষ্মের দাবদাহ নিয়মিত বিষয়। গরমে শরীর সতেজ রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তৃষ্ণা মেটাতে আমরা কখনো ফ্রিজের বরফশীতল পানি, কখনো এনার্জি ড্রিংক আবার কখনো পথের ধারের শরবতে চুমুক দিই। কিন্তু শরীরের অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞানের সঙ্গে এই পানীয়গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল পানীয় নির্বাচন এই গরমে আপনার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘তৃষ্ণা নিবারণে উপযুক্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে হয়, যেকোনো পদ্ধতিতে মাটির নিচ থেকে উত্তোলিত পানি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।’
কেন বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই আমাদের শরীরের ৬০-৭০ শতাংশ পানি। প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং হরমোনের কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমাদের শরীরের অধিকাংশ তরল উপাদানের পিএইচ মান ৭-এর কাছাকাছি। বিশুদ্ধ পানির পিএইচ মানও ঠিক ৭। মো. ইকবাল হোসেন বলেন, বিশুদ্ধ পানির পিএইচ মান এবং বিশুদ্ধ পানির তাপমাত্রা আমাদের শরীরের তাপমাত্রার খুব কাছাকাছি। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানি, যা আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত, তা আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
ফ্রিজের ঠান্ডা পানি নয় কেন
তীব্র রোদ থেকে এসে এক গ্লাস বরফশীতল পানি পান করা অনেকের অভ্যাস। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলেন, আমাদের শরীরের অর্গানগুলো ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে। সরাসরি ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান করলে শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই মো. ইকবাল হোসেন ফ্রিজের ঠান্ডা পানি সরাসরি পান না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘কক্ষ তাপমাত্রায় পৌঁছালে পানি পান করতে হবে। অথবা ঠান্ডা পানির সঙ্গে স্বাভাবিক পানি মিশিয়ে পান করতে হবে।’স্পোর্টস ড্রিংক বনাম এনার্জি ড্রিংকবাজারে পাওয়া যায় এমন রঙিন পানীয়গুলোর মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।
স্পোর্টস ড্রিংক: এতে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইট থাকে, যা ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া লবণের ঘাটতি পূরণ করে। যাঁরা রোদে টানা এক ঘণ্টার বেশি কঠোর পরিশ্রম বা ব্যায়াম করেন, শুধু তাঁদেরই এটি প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ চলাফেরায় বাড়তি চিনিযুক্ত এই পানীয়ের প্রয়োজন নেই। কারণ, আমাদের নিয়মিত খাবার থেকে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট পেয়ে যায় শরীর।
এনার্জি ড্রিংক: এটি কোনোভাবেই পানির বিকল্প নয়। এতে থাকা উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন শরীরকে আরও বেশি পানিশূন্য করে তোলে। এ ছাড়া শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং বড়দের ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড় কিংবা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
সতেজ থাকার সহজ উপায়
সফট ড্রিংকস বা কৃত্রিম শরবতের বদলে তরমুজ কিংবা নারকেলের মতো পানিতে পূর্ণ ফল খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। পিপাসার জন্য অপেক্ষা না করে সারা দিন অল্প অল্প পানি পান করুন। মনে রাখবেন, তৃষ্ণা মেটানোর চেয়ে শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা এই গরমে বেশি জরুরি। আপনার সঠিক পানীয় নির্বাচনই হতে পারে গরমে সুস্থ থাকার প্রধান উপায়। এ ছাড়া হিট স্ট্রোক থেকেও এটি সুরক্ষা দেবে।
কতটুকু পানি পান করবেন?
সাধারণভাবে দৈনিক ৮ গ্লাস বা ২ লিটার পানির কথা বলা হলেও প্রচণ্ড গরমে এর পরিমাণ বাড়তে পারে। পুষ্টিবিদ মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘শরীরের চাহিদার অতিরিক্ত পানি পান করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এই বিশুদ্ধ পানি পান করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে এতে আর্সেনিক এবং আয়রনের পরিমাণ আমাদের শরীরে অনুমোদিত সীমার মধ্যে আছে কি না। এ ব্যাপারে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে পারেন। যাঁরা রোদে কাজ করছেন, তাঁদের প্রতি ১৫-২০ মিনিটে অন্তত এক কাপ পানি পান করা উচিত। তবে সাবধান! ঘণ্টায় দেড় লিটারের বেশি পানি পান করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রক্তে লবণের ঘনত্ব কমে যেতে পারে।’
সূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ,হেলথ লাইন