শীতের হিমেল হাওয়া আমাদের ত্বকে টান ধরায়। শুধু তা-ই নয়, এটি আমাদের কানের স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। শীতকালীন ঠান্ডা ও আর্দ্রতা কানে ইনফেকশন থেকে শুরু করে শ্রবণশক্তির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও করতে পারে। এই সময় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সক্রিয় হয়ে ওঠে। সারা বছর কানে সংক্রমণ হলেও শীতকালে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। এর কারণ ও প্রতিকারের উপায় জেনে রাখলে সুবিধা পাওয়া যায়।
নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হেড-নেক সার্জন ডা. মো. আবদুল হাফিজ শাফী বলেন, সাধারণত কানের বাইরের দিকে বা মিডল ইয়ারে সংক্রমণ হয়ে থাকে। ঠান্ডা লাগলে নাকের সর্দি কানের দিকে চলে গিয়ে সংক্রমণ হয়। বয়স্ক থেকে শিশু—সবার এটি হতে পারে।
শরীর ও কান উষ্ণ রাখুন
শীতকালে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সচল রাখতে গরম কাপড় পরা জরুরি। আমাদের কানের বেশির ভাগ অংশ কার্টিলেজ কিংবা তরুণাস্থি দিয়ে গঠিত এবং এতে চর্বির স্তর খুব পাতলা থাকে। তাই শরীরের অন্য অংশের তুলনায় কান খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে কান ঢেকে রাখা উচিত। একে ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে মাফলার, কানটুপি অথবা ইয়ারমাফ ব্যবহার করুন। এটি আপনাকে এক্সোস্টোসিস নামক সমস্যা থেকে রক্ষা করবে।
অতিরিক্ত শব্দ থেকে সাবধান
শীতকালে যেকোনো মেশিন বা বড় কোনো যন্ত্র ব্যবহারের সময় কানের সুরক্ষায় ভুল করবেন না। মনে রাখবেন, ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ কানের ক্ষতি করতে শুরু করে। তাই যদি এমন কোনো জায়গায় থাকেন বা কাজ করেন, যেখানে অনেক শব্দ; সেখানে নয়েজ-রিডিউসিং হেডফোন বা ইয়ার প্লাগ ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ান
শীতকালে সর্দি কিংবা আপার রেসপিরেটরি সংক্রমণ থেকে কানে প্রচণ্ড ব্যথা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। ডায়েটে ভিটামিন সি, ডি, জিঙ্ক এবং প্রোবায়োটিকসসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি ও পানি পান করার পাশাপাশি শরীরচর্চা করুন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। মানসিক চাপ কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শীতকাল এলেই যাঁদের কানের সংক্রমণে ভুগতে হয়, তাঁদের নিয়মিত নাক পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন ডা. মো. আবদুল হাফিজ শাফী। তিনি বলেন, এতে সংক্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পথ বা নালি স্বাভাবিক থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বাজারে প্রচলিত সাধারণ স্যালাইন নাকের ড্রপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। শীতকালে ঠান্ডা সর্দি লাগার পর অনেক শিশু তাদের কানের ব্যথার কথা বলে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের কথা বলেন তিনি।
কান শুকনো রাখুন
বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে কানে আর্দ্রতা জমে গেলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। ডা. মো. আবদুল হাফিজ শাফী বলেন, খুব ঠান্ডা লেগে আপার রেসপিরেটরি ট্রাক্টে সংক্রমণ হলে তা পৌঁছে যেতে পারে কানে। সাধারণত এ ক্ষেত্রে স্ট্রেপটোককাস নিউমোনিয়া বা হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ব্যাকটেরিয়া কানে প্রদাহ তৈরি করে। সেখান থেকে কানের মাঝখানের অংশে তরল পদার্থ জমা হয়। গোসলের পর কিংবা বাইরে থেকে ফেরার পর কানের ছিদ্রের চারপাশ নরম কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছে নিন। কানে পানি ঢুকলে মাথা কাত করে কানের লতি টেনে পানি বের করে দিন।
হিয়ারিং এইডের বিশেষ যত্ন
যদি আপনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেন, তাহলে শীতকালে এর বাড়তি যত্নের প্রয়োজন আছে। অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে এই যন্ত্রের ব্যাটারির আয়ু কমে যায় এবং বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হিয়ারিং এইডের ভেতরে আর্দ্রতা অথবা কনডেনসেশন তৈরি হতে পারে। বাইরে যাওয়ার সময় কানটুপির নিচে হিয়ারিং এইড ঢেকে রাখুন। ঘরে ফেরার পর ব্যাটারি কম্পার্টমেন্ট খুলে রাখতে হবে, যাতে বাতাস ঢুকে জমে থাকা জলীয় বাষ্প শুকিয়ে যেতে
সহায়ক হয়।