হোম > স্বাস্থ্য

হাম পরিস্থিতি: টিকাদান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি কম

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা

এবার হামের সংক্রমণে শিশুমৃত্যু গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আক্রান্তদের জায়গা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। বাড়ছে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা। গতকাল রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালে।ছবি: আজকের পত্রিকা

টিকাদানে ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে চলতি বছরে দেশে অতিসংক্রামক রোগ হাম খুব দ্রুত এবং বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। গত দেড় দশকের মধ্যে অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা দিয়েছে এবার। আর শিশুমৃত্যু হয়েছে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে রোগটির জন্য বাংলাদেশ ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় থাকলেও টিকাদান ছাড়া মাঠপর্যায়ের অন্যান্য প্রস্তুতিতে সরকারের তৎপরতা জোরালো নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বছরের প্রথম দিকে হামের সংক্রমণ হলেও সরকার পরিসংখ্যান রাখা শুরু করে গত ১৫ মার্চ থেকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮৫৬ শিশুর। একই সঙ্গে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৬৬২ শিশু। গতকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ শিশুর। আর ২২৬ শিশুর মৃত্যু হামে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সে হিসাবে হাম ও এর উপসর্গে মোট মারা গেছে ২৭৩ শিশু।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে হামের সংক্রমণ গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩জন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। ২০০৫ সালে তা বেড়ে ২৫ হাজার ৯৩৪-এ দাঁড়ায়। এরপর ২০০৬ সাল থেকে রোগীর সংখ্যা ক্রমে কমেছে। ২০০৬ সালে রোগী ছিল ৬ হাজার ১৯২ জন। ২০০৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সর্বনিম্ন ২০৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৮২৭ জন রোগী পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ২৮১, ২০২৪ সালে ২৪৭ এবং ২০২৫ সালে ১২৫ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়। তবে আগের বছরভিত্তিক মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। আর ২০২৬ সালে এসে আবার আক্রান্তের সংখ্যায় বড় উল্লম্ফন ঘটেছে।

বাংলাদেশের হাম বিস্তারের এবারের চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে গত বৃহস্পতিবার বিবৃতি দিয়েছে। এরপর গত রোববার রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে এক সমন্বয় সভায় ডব্লিউএইচও জানায়, দেশের ৬১টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানে ঘাটতি এবং মৃত্যুর ঘটনা বিবেচনায় পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

রোগতত্ত্ববিদদের মতে, ডব্লিউএইচওর ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতা বাস্তবে মহামারিসদৃশ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এমন অবস্থায় জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কিন্তু এখনো অভিন্ন ক্লিনিক্যাল প্রটোকল, স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সারা বছর শিশু ও নারীদের ১২টি রোগপ্রতিরোধে ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর টিকাও অন্তর্ভুক্ত। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রতিবছর অন্তত ১০ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। আলাদা ‘ক্যাম্পেইনের’ মাধ্যমে সেই শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী আজকের পত্রিকাকে বলেন, হাম নির্মূল করতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। নিয়মিত টিকাদান ও ক্যাম্পেইনের কারণে একসময় বাংলাদেশ প্রায় নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি ২০২৫ সালে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ৭-এ নেমে আসে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বড় অর্জন। কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়া, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে কম কভারেজ এবং ক্যাম্পেইনে বিলম্বের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে আবার সংক্রমণ বেড়েছে।

হামের উচ্চ সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ৫ এপ্রিল থেকে হাম-রুবেলা (এমআর) বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। গত সোমবার পর্যন্ত ১৯ দিনে ৯৪ লাখ ২৩ হাজার শিশু এই টিকা (এমআর টিকা) পেয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫২ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ কর্মসূচি ১২ মে পর্যন্ত চলবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি মূলত রোগ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের ফল। শিশুদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অসম প্রস্তুতির কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ডা. মুশতাকের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সমন্বিত ‘স্ট্যান্ডার্ড ইমার্জেন্সি পাবলিক হেলথ রেসপন্স’ চালু করা জরুরি। যেখানে রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের আইসোলেশন, ব্যাপক টিকাদান, জনসচেতনতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। সময়মতো বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত না নিলে অতিসংক্রামক রোগে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

ডেনমার্কের প্রযুক্তিতে দেশে আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ উৎপাদন শুরু

হাম ও উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

তরমুজ খেলে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি আছে কি

হামের টিকা পেয়েছে ৯৪ লাখ ২৪ হাজার শিশু: তথ্য উপদেষ্টা

হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

হাম ও উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

হাড় সুস্থ রাখতে যা করবেন

জলাতঙ্ক: আতঙ্ক নয় সচেতনতাই বাঁচার পথ

চোখের নিয়মিত পরীক্ষা কেন এবং কখন প্রয়োজন