হোম > ফ্যাক্টচেক > জানি, কিন্তু ভুল

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন দেখা ক্ষতিকর— এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে নাকি অতিরঞ্জন

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন দেখা কি সত্যিই ক্ষতিকর?

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে মানসিক শক্তি কমে যায়, মনোযোগ নষ্ট হয় কিংবা দিনের শুরুতেই মানসিক চাপ বাড়ে—এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। তবে বিষয়টি বাস্তবে যতটা সরলভাবে বলা হয়, গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, সেটি ততটা সরল নয়; বরং এখানে কিছু সত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জন ও ভুল ব্যাখ্যাও মিশে আছে।

দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠেই নোটিফিকেশন চেক করেন, খবর পড়েন এবং দিন শুরু হওয়ার আগেই কাজের চাপ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুতে অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তবে ‘সকাল ৯টার মধ্যেই অধিকাংশ মানসিক শক্তি শেষ হয়ে যায়’—এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ইভান কার্টার ও মার্টিন হ্যাগার এক গবেষণায় প্রমাণ করেন, মানুষের ইচ্ছাশক্তি বা মানসিক শক্তি কোনো সীমিত ব্যাটারি নয় যা সময়ের সাথে ফুরিয়ে যায়। এই গবেষণাগুলো প্রচলিত ‘ইগো ডিপ্লেশন’ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করে দেখিয়েছে। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখানো হয়েছে, সকাল ৯টার মধ্যে শক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার দাবিটি মূলত মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মানসিকতার ওপর নির্ভর করে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় প্রায়ই বলা হয়, ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক ‘আলফা ব্রিজ’নামে একটি বিশেষ অবস্থায় থাকে এবং ফোন ব্যবহার করলে তা নষ্ট হয়। তবে বাস্তবে ‘ডেল্টা-থেটা-আলফা-বেটা’ তরঙ্গের এই ধারাবাহিক ব্যাখ্যাটি গবেষণায় এতটা সরলভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ঘুম থেকে জাগরণের সময় মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ দেখা গেলেও শুধু ফোন ব্যবহার সরাসরি মস্তিষ্ককে ‘হাই-বেটা’ জরুরি অবস্থায় ঠেলে দেয়—এমন দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণের অভাব রয়েছে।

তবে সকালবেলায় ফোন ব্যবহারের কিছু বাস্তব প্রভাব নিয়ে গবেষণা আছে। বিশেষ করে ডিজিটাল নোটিফিকেশন, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মানুষের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। Gloria Mark–এর গবেষণায় দেখা গেছে, মনোযোগ একবার বিচ্যুত হলে কাজে ফিরতে গড়ে ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগতে পারে। ফলে দিনের শুরুতেই ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কাজের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) হিউম্যান ডায়নামিকস ল্যাবরেটরির গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনের শুরুতে প্রথম এক ঘণ্টা কোনো প্রকার ডিজিটাল যোগাযোগ ছাড়াই কাটান, তাঁদের সারা দিনের উৎপাদনশীলতা অন্যদের তুলনায় বেশি থাকে। কারণ তাঁরা দিনের শুরুতেই অন্যের এজেন্ডার কাছে নিজের মনোযোগ সমর্পণ করেন না। অর্থাৎ সকালে তথ্যের চাপ মানুষকে বেশি ‘রিঅ্যাকটিভ’ (প্রতিক্রিয়াশীল) করে তুলতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ঘটে না; ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকে।

ডোপামিন বা ‘ডোপামিন বুফে’ সংক্রান্ত আলোচনাও প্রায়ই অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে স্বল্পমাত্রার নৈতিক বাধ্যবাধকতার প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি দ্রুত ইচ্ছাশক্তি শেষ করে দেয়—এমন সরল ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। একইভাবে ‘সকালে ফোন দেখলে আইকিউ ১০ পয়েন্ট কমে যায়’—এমন দাবি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তবে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের বিষয়টি আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিক। ঘুম থেকে ওঠার পর স্বাভাবিকভাবেই কর্টিসলের মাত্রা কিছুটা বাড়ে, যাকে ‘Cortisol Awakening Response’ বলা হয়। এই সময় যদি কেউ অতিরিক্ত তথ্যের চাপে পড়ে, তাহলে মানসিক চাপ অনুভূত হতে পারে। কিন্তু শুধু ফোন দেখার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে তা বলা যায় না।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিষ্ঠিত—সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ‘সোশ্যাল কম্প্যারিজন’ বা অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে কিছু মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বা হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যদি তারা দিনের শুরুতেই নেতিবাচক কনটেন্টের মুখোমুখি হন। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ১৪৩ জন শিক্ষার্থীকে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদলকে প্রতিদিন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি, আর অন্য দলকে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য দিনে মাত্র ১০ মিনিট (মোট ৩০ মিনিট) বরাদ্দ করা হয়েছিল। ফলাফলে দেখা গেল, যারা দিনে মাত্র ৩০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেছেন, তাঁদের মধ্যে একাকীত্ব এবং বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এ ছাড়া, অ্যাড্রিয়ান এফ. ওয়ার্ডের গবেষণাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেটিকে তিনি ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বলে অভিহিত করেছেন। এই গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণ হলো, স্মার্টফোন ব্যবহার করা তো দূরের কথা, এটি স্রেফ চোখের সামনে বা হাতের নাগালে থাকলেই মানুষের চিন্তা করার বা কগনিটিভ ক্যাপাসিটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এই গবেষণায় আরও বলা হয়, স্মার্টফোন যত বেশি কাছে থাকে, মানুষের ওয়ার্কিং মেমোরি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তত বেশি কমে। এমনকি যারা মনে করেন যে তাঁরা ফোনের উপস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন না, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই কগনিটিভ রিসোর্স ড্রেন বা চৈতন্যের শক্তি ক্ষয়ের হার একই রকম দেখা গেছে। এটি প্রমাণ করে, ফোনের উপস্থিতি আমাদের অজান্তেই মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতায় ভাগ বসায়।

বিশেষজ্ঞরা তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলেন না, বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পরামর্শ দেন। অনেক ঘুম ও আচরণবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুতে কিছু সময় নিজের মতো কাটানো—যেমন হালকা ব্যায়াম, প্রাকৃতিক আলোতে থাকা বা পরিকল্পনা করা—মানসিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটিকে অনেক সময় ‘ডিজিটাল বাফার’ বা ফোনমুক্ত সময় বলা হয়, এটি কিছু মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে।

সিদ্ধান্ত

সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্মার্টফোন ব্যবহার করলে মানসিক শক্তি দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়, আইকিউ কমে যায় বা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন দাবিগুলো কখনো অতিরঞ্জিত, কখনো বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে দিনের শুরুতে অতিরিক্ত নোটিফিকেশন ও তথ্য গ্রহণ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চাপও বাড়াতে পারে। তাই এটি সম্পূর্ণ ক্ষতিকর না হলেও, নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পন্থা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

আরেকটু ঘুমাই— অ্যালার্ম স্নুজ করার ছোট্ট অভ্যাসেই বরবাদ সারা দিন

ফোনের নীল আলো কি ঘুমের শত্রু, গবেষণা কী বলে

ঘুম থেকে উঠেই চা-কফি—অজান্তেই ডেকে আনছেন স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী: রহস্য নাকি বানোয়াট গল্প

আইনস্টাইন কি গণিতে ফেল করেছিলেন

পূর্ণিমা রাতে মেজাজ খিটখিটে হয়, অপরাধ বাড়ে—এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি

গাজর খেয়ে অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা অর্জনের গল্প ছড়াল যেভাবে

ব্রণ দূর করার ক্ষেত্রে টুথপেস্টের ব্যবহার কার্যকরী? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

খাওয়ার সময় পানি পান কি হজমে সমস্যা করে, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

চর্বিযুক্ত খাবার খেলে কি ওজন বেড়ে যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে