হোম > ফ্যাক্টচেক > জানি, কিন্তু ভুল

ফোনের নীল আলো কি ঘুমের শত্রু, গবেষণা কী বলে

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

ফোনের নীল আলো কি সত্যিই ঘুম নষ্ট করে?

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বলা হচ্ছে, ডিজিটাল স্ক্রিন বা পর্দার নীল আলোই নাকি ঘুম নষ্টের প্রধান কারণ। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ঘুমানোর আগে ফোন বা অন্য ডিভাইস ব্যবহার করলেই ঘুমের সমস্যা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাঁদের মতে, বিষয়টি অতটা সরল নয়; বাস্তবতা আরও জটিল। আসলে ঘুমের সমস্যার জন্য দায়ী কেবল ফোনের নীল আলো নয়—এর পেছনে রয়েছে আরও কিছু কারণ।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নীল আলো ঘুমের ওপর কিছু প্রভাব ফেলতে পারে ঠিকই, তবে সেটি শক্তিশালী প্রভাবক নয়। নীল আলো নিয়ে এই আতঙ্ক শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের একটি গবেষণার পর। ১২ জন অংশগ্রহণকারীর অর্ধেক ঘুমানোর আগে আইপ্যাডে বই পড়তেন, আর বাকিরা সাধারণ কাগুজে বই। দেখা গেল আইপ্যাড ব্যবহারকারীদের ঘুমাতে দেরি হচ্ছে, পরের দিন তাঁরা বেশি ক্লান্তি অনুভব করছেন এবং তাঁদের শরীরে মেলাটোনিন (ঘুমের জন্য দায়ী হরমোন) কম উৎপন্ন হচ্ছে। গবেষকেরা তখন বলেছিলেন, এর জন্য দায়ী আইপ্যাডের এলইডি স্ক্রিন থেকে নির্গত আলো, যা বর্ণালীর ওপরের স্তরের অর্থাৎ প্রচুর নীল আলো তৈরি করে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নীল আলো আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (শরীরের প্রাকৃতিক পেসমেকার) ব্যাহত করে। মূলত এখান থেকেই নীল আলো নিয়ে উদ্বেগের শুরু।

পরবর্তীতে অনেক বিশেষজ্ঞ মত দেন, এই ফলাফল বাস্তব জীবনের সাধারণ আলোক-পরিবেশকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রি এবং বিহেভিওরাল সায়েন্সের গবেষক অধ্যাপক জেমি জেইটজার বলেন, ‘এটি ছিল একটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর (গবেষণা) কাজ।’

ঘুম ও সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ে গবেষণা করা জেমি জেইটজার আরও বলেন, আমাদের চোখে থাকা ‘মেলানোপসিন’ নামের একটি আলোকসংবেদী প্রোটিন নীল আলোর প্রতি বেশি সংবেদনশীল। এই কারণে নীল আলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শরীরের জৈবঘড়িতে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ফোন বা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে যে পরিমাণ নীল আলো বের হয়, তা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

বছরের পর বছর সতর্কতা এবং কোটি কোটি মানুষের চশমার কাচে বা ডিসপ্লেতে ব্লু-লাইট ফিল্টার ব্যবহারের পর সাম্প্রতিক বিজ্ঞান বলছে, স্ক্রিন আসলে মূল অপরাধী নয়। গবেষণাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্ক্রিনের আলো ঘুমের সময় গড়ে প্রায় ৯ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে। অর্থাৎ, প্রভাব পুরোপুরি শূন্য নয়, তবে তা জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মতোও নয়। আরও কিছু গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে ২৪ ঘণ্টায় যত নীল আলো বের হয়, তা বাইরে মাত্র এক মিনিট সূর্যের আলোয় থাকার সমান। ফলে শুধু ফোনের আলোকে ঘুমের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখাটা অতিরঞ্জিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোর সংস্পর্শে থাকা মোট সময় এবং দিন-রাতের আলোর পার্থক্য। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত উজ্জ্বল আলো না পাওয়া এবং রাতে তুলনামূলক বেশি আলোতে থাকা—এই অভ্যাসই ঘুমের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকেই সারাদিন ঘরের ভেতর কম আলোতে থাকেন, আবার রাতে কৃত্রিম আলোতে সক্রিয় থাকেন। এতে জৈবঘড়ি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

গবেষকেরা বলছেন, সকালে বেশি আলো শরীরকে জাগ্রত করে এবং রাতে কম আলো শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। এই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। তাই আলো ব্যবহারের ধরনই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্ক্রিনে কী দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোনের আলো যতটা না সমস্যা, তার চেয়ে বেশি সমস্যা হলো উত্তেজনাপূর্ণ বা মনোযোগ-কাড়া কনটেন্ট দেখা। ঘুমানোর আগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল, ভিডিও দেখা বা মানসিকভাবে সক্রিয় করে এমন কাজ করলে মস্তিষ্ক জাগ্রত থাকে, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।

অনেক ডিভাইসে ব্লু-লাইট ফিল্টার বা নাইট মোড থাকলেও গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলোর প্রভাব সীমিত। তবে এগুলো একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে—স্ক্রিনের রঙ বদলে গেলে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে এখন ঘুমানোর সময় ঘনিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের জন্য সকালে প্রাকৃতিক আলোতে থাকা, দিনে পর্যাপ্ত উজ্জ্বল আলোতে কাজ করা, সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে আলো কমানো, ঘুমানোর আগে উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট এড়িয়ে চলা এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি কার্যকর।

মোটকথা, ফোন স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেললেও এটি ঘুম নষ্টের প্রধান কারণ নয়। বরং দিনের উজ্জ্বল আলোতে কম থাকা, রাতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো ব্যবহার এবং ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন—এই বিষয়গুলোই ঘুমের ওপর বেশি ভূমিকা রাখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

ঘুম থেকে উঠেই চা-কফি—অজান্তেই ডেকে আনছেন স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী: রহস্য নাকি বানোয়াট গল্প

আইনস্টাইন কি গণিতে ফেল করেছিলেন

পূর্ণিমা রাতে মেজাজ খিটখিটে হয়, অপরাধ বাড়ে—এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি

গাজর খেয়ে অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা অর্জনের গল্প ছড়াল যেভাবে

ব্রণ দূর করার ক্ষেত্রে টুথপেস্টের ব্যবহার কার্যকরী? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

খাওয়ার সময় পানি পান কি হজমে সমস্যা করে, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

চর্বিযুক্ত খাবার খেলে কি ওজন বেড়ে যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার মানুষকে স্থূল করে? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

সান্ডার তেলে কি কাজ হয়, চিকিৎসকেরা কী বলছেন