হোম > ফ্যাক্টচেক > জানি, কিন্তু ভুল

আরেকটু ঘুমাই— অ্যালার্ম স্নুজ করার ছোট্ট অভ্যাসেই বরবাদ সারা দিন

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

আর একটু ঘুমাই—এই অভ্যাসই কিভাবে দিনের শক্তি কমিয়ে দেয়। ছবি: স্ক্রিনশট

সকালে অ্যালার্ম বাজার পর অনেকেই চোখ বন্ধ রেখেই বলেন—‘আর ৫ বা ১০ মিনিট ঘুমাই।’ মনে হয়, এতে শরীরটা আরও সতেজ হবে। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই ছোট্ট অভ্যাসই দিনের শুরুটাকে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অ্যালার্মের স্নুজ বাটন (অ্যালার্মের যে ফিচার অ্যালার্ম বন্ধ না করে কয়েক মিনিটের জন্য থামিয়ে রাখে এবং পরে আবার বাজতে দেয়।) চাপলে আমরা আবার হালকা ঘুমে ঢুকে পড়ি। তখন শরীর নতুন একটি ঘুমচক্র শুরু করতে চায়, যার স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ মিনিট। কিন্তু সেই চক্র সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই আবার অ্যালার্মের কারণে জেগে উঠতে হয়। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। এই অবস্থাটিই ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ বা নিদ্রাজড়তা নামে পরিচিত। এটি নিয়ে নেচার (Nature) ও স্প্রিঙ্গার (Springer) -এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে—এই পর্যায়ে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কমে যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই অবস্থায় মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিক্রিয়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথে (এনআইএইচ) প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিদ্রাজড়তার প্রভাব কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, বিশেষ করে যদি গভীর ঘুম থেকে হঠাৎ জাগানো হয়।

সকালের স্নুজ অভ্যাস নিয়ে জার্নাল অব সাইকোলজিক্যাল অ্যান্থ্রপলোজি -এ প্রকাশিত ২০২২ সালের একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, স্নুজ ব্যবহারকারীরা ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী একটি অস্থির অবস্থায় থাকেন। তাঁরা পুরোপুরি ঘুমাতে পারেন না, আবার পুরোপুরি জেগেও উঠতে পারেন না—ফলে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত অবস্থায় থাকে এবং নিদ্রাজড়তা আরও বাড়ে।

নিদ্রাবিজ্ঞানের ভাষায় হোমিওস্ট্যাটিক স্লিপ ড্রাইভ এবং সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি— এই দুটি প্রধান প্রক্রিয়ায় আমাদের ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয়। স্লিপ মেডিসিন রিভিউজ -এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোতে বলা হয়েছে, এই দুই প্রক্রিয়ার সমন্বয় শরীরকে নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে ও জাগতে সাহায্য করে। কিন্তু বারবার স্নুজ চাপলে এই স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয় এবং জেগে ওঠার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।

হরমোনগত দিক থেকেও এর প্রভাব রয়েছে। সাইকো নিউরো এন্ডোক্রাইনোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ‘Cortisol Awakening Response (CAR) ’ নিয়ে বলা হয়েছে, সকালে ঘুম ভাঙার সময় কর্টিসল হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা আমাদের জাগতে সাহায্য করে। কিন্তু স্নুজের কারণে এই প্রাকৃতিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। একই সঙ্গে মেলাটোনিনের প্রভাব পুরোপুরি কাটতে সময় লাগে, ফলে জেগে উঠলেও শরীর ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না।

এ ছাড়া স্লিপ (Sleep) জার্নালে প্রকাশিত ‘স্লিপ ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বিষয়ক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ঘুম বারবার ভাঙার ফলে যদি মোট ঘুমের সময় ঠিক থাকে—তবুও শরীরের স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে গভীর ঘুম কমে গেলে কোষ মেরামত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের বিশ্রাম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না। স্নুজ বাটন এই ভাঙা ঘুমের একটি সাধারণ কারণ হিসেবে বিবেচিত।

পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। হেলথ (Health) -সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়মিত স্নুজ ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক বেশি ক্লান্তি অনুভব করেন এবং দিনের শুরুতে তাঁদের শক্তি কম থাকে। যদিও অনেকেই স্নুজকে ধীরে ধীরে জাগার উপায় হিসেবে দেখেন, বাস্তবে এটি ঘুমের শেষ অংশটুকুকে আরও অগোছালো করে দেয়। এ জন্য অনেকেই এখন ‘ওয়ান-টাচ রুল’ মেনে চলেন। অর্থাৎ অ্যালার্ম বাজলে একবারেই উঠে পড়া।

তার মানে, স্নুজ বাটন চাপা সাময়িক আরাম দিলেও এটি ঘুমের গুণগত মান কমায়, শরীরের স্বাভাবিক জৈব ছন্দে ব্যাঘাত ঘটায় এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। তাই ভালোভাবে দিন শুরু করতে চাইলে স্নুজের বদলে একবারেই জেগে ওঠা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই বেশি কার্যকর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

ফোনের নীল আলো কি ঘুমের শত্রু, গবেষণা কী বলে

ঘুম থেকে উঠেই চা-কফি—অজান্তেই ডেকে আনছেন স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী: রহস্য নাকি বানোয়াট গল্প

আইনস্টাইন কি গণিতে ফেল করেছিলেন

পূর্ণিমা রাতে মেজাজ খিটখিটে হয়, অপরাধ বাড়ে—এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি

গাজর খেয়ে অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা অর্জনের গল্প ছড়াল যেভাবে

ব্রণ দূর করার ক্ষেত্রে টুথপেস্টের ব্যবহার কার্যকরী? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

খাওয়ার সময় পানি পান কি হজমে সমস্যা করে, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

চর্বিযুক্ত খাবার খেলে কি ওজন বেড়ে যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার মানুষকে স্থূল করে? চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে