কুড়িগ্রাম জেলা যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আয়সা সুলতানাকে বিএনপি নেতা-কর্মীরা নির্মম নির্যাতন করেছে— এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দাবিতে ফেসবুকে পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে , এখানে, এখানে এবং এখানে ।
‘নোয়াখালি জেলা আওয়ামীলীগ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ১৯ মে দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে আলোচিত দাবিতে একটি ভিডিওটি শেয়ার করা হয়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। শেয়ার করা ওই ভিডিওটি আজ (২০ মে) সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার বার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ১ হাজার ২০০ রিয়েকশন, ২৩০ কমেন্ট ও ৮৭৯ শেয়ার রয়েছে।
‘মুজিব সৈনিক’ নামের একটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়, ‘কুড়িগ্রাম জেলা যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আয়শা সুলতানাকে ইউনুসের রেখে যাওয়া মব সন্ত্রাসী কর্মী দ্বারা নি’র্মম নি’র্যাতন। মনে রেখো বাংলাদেশ।’
এ ছাড়া ‘মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক’ নামের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবি প্রচার করা হয়। এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী আলোচিত দাবিটিকে সত্য মনে করে কমেন্ট করেছেন।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ দেখা যায়, একজন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে, তিনি কাঁদছেন। তবে ভিডিওর ক্যাপশনে কুড়িগ্রামের যুব মহিলা লীগ নেত্রীর কথা বলা হলেও ঘটনাটি কবে ও কোথায় ঘটেছে, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যের উল্লেখ নেই। জাতীয় গণমাধ্যমেও কুড়িগ্রামে এমন কোনো রাজনৈতিক নির্যাতনের ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
ভিডিওটির প্রকৃত উৎস খুঁজতে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ‘সিংগাইর সময় টিভি’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১৭ মে দুপুর ১২টা ৫৩ মিনিটে শেয়ার করা একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে ছবি দুটির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর নারীর চেহারা ও পোশাকের মিল রয়েছে। সেখানে পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, মানিকগঞ্জের শিবালয়ে একটি বাড়ি থেকে ২০ হাজার টাকা চুরি করার পর ওই নারী গ্রামবাসীর কাছে ধরা পড়েছেন।
আরও অনুসন্ধানে ‘Ěmøń Åhmëđ Jøý’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১৮ মে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে শেয়ার করা একটি স্পষ্ট ভিডিও পাওয়া যায়, যেটির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে। ওই ভিডিওর একপর্যায়ে ক্যামেরার পেছন থেকে এক ব্যক্তিকে ওই নারীকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার বাড়ি কোনে?’ এর উত্তরে উপস্থিত অন্য একজন বলেন, ‘মানিকগঞ্জ।’ এ সময় একই ব্যক্তিকে আবার বলতে শোনা যায়, ‘মানিকগঞ্জ কোন জায়গায়?’
পুরোপুরি নিশ্চিত হতে মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বিষয়ের সম্পর্ক বা উদ্দেশ্য নেই।’
ওসি মনির হোসেন ঘটনার বিবরণে জানান, ওই নারী শিবালয় থানার অন্তর্গত টেপরা এলাকার একটি বাড়ি থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা চুরি করেন। স্থানীয় লোকজন টের পেয়ে তাঁকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং মারধর ও মাথার চুল কেটে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। খবর পেয়ে শিবালয় থানা-পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার ও আটক করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী ‘লোভে পড়ে চুরি’র করার কথা স্বীকার করেন। ওসি আরও জানান, যে ব্যক্তির বাড়িতে চুরি হয়েছে তিনি বাদী হয়ে থানায় একটি চুরির মামলা করেছেন এবং পুলিশ অভিযুক্ত নারীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
এ ছাড়া আলোচিত দাবিতে শেয়ার করা পোস্টের বেশিরভাগ অ্যাকাউন্ট ও পেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এগুলোতে মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থিত কনটেন্ট পোস্ট করা হয়।
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে চুরির অভিযোগে এক নারীকে বেঁধে রাখার ভিডিওকে কুড়িগ্রাম জেলা যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদককে বিএনপি কর্মীদের নির্যাতনের দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।