‘জুলাই যোদ্ধা বলে কিছু নাই, সংবিধান অনুযায়ী এটা অন্যায়’—আমীর হোসেন খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে এমন দাবিতে একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
‘চট্টলা সংবাদ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ার করা ফটোকার্ডটিতে আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার রিয়েকশন পড়েছে। পোস্টটি ২ হাজার ৯০০ বার শেয়ার হয়েছে এবং এতে ৯ হাজার মন্তব্য রয়েছে।
পোস্টের কমেন্টে যাচাই করে দেখা যায়, বেশির ভাগ কমেন্টে আমীর খসরুর নামে প্রচারিত এই মন্তব্য দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা করেছে।
এই দাবিতে ফেসবুকে পোস্ট রয়েছে এখানে , এখানে , এখানে এবং এখানে ।
অনুসন্ধানের শুরুতেই আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ‘চট্টলা সংবাদ’ নামের লোগো দেখা যায়। পেজটিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে কার্ডটি পোস্ট করা হয়েছে। তবে পোস্টটিতে আলোচিত দাবির বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া জাতীয় গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে ‘Voice of Bangla’ নামের একটি ফেসবুক পেজে জাতীয় দৈনিক সমকালের বরাত দিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ৪৬ মিনিটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ‘মুক্তিযুদ্ধ জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশের জায়গায় চব্বিশ: আমির খসরু’ শিরোনামে সমকালে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ আর চব্বিশ পরস্পরবিরোধী কিছু না বলে মন্তব্য করেছেন নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরদিন, বুধবার প্রথম কর্মদিবসের সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি এ কথা বলেন। আমীর খসরু জানান, গত ২০ বছরও অনেক কষ্ট করে, বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। তবে এবার তা পোহাতে হয়নি।
তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ‘অর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আমীর খসরু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ, চব্বিশের জায়গায় চব্বিশ। এটি একটার সঙ্গে আরেকটা পরস্পরবিরোধী কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধ এই দেশের জন্মের যুদ্ধ, আর চব্বিশ হচ্ছে স্বৈরাচার নিপাত করে গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ। সুতরাং দুইটিরই আলাদা মূল্য ও গুরুত্ব রয়েছে। দুইটিকেই সম্মান করতে হবে।’
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ হওয়ার পর অনেক সমস্যা অতিক্রম করতে হয়েছে উল্লেখ করে আমীর খসরু বলেন, ‘অনেক প্রতিবাদ হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, মানুষ জীবন দিয়েছে। সবাইকে মাথায় রাখতে হবে, কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না।’
অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভির ফেসবুক পেজে একই দিন বেলা ১২টা ১৫ মিনিটে ‘বাংলাদেশকে জনগণের স্বার্থে গড়ে তুলতে হবে, ব্যক্তি স্বার্থে নয়’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এ ছাড়া বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির পেজেও ‘দেশের জন্য ত্যাগীদের সম্মান জানানোই আমাদের প্রথম দায়িত্ব: আমীর খসরু’ শিরোনামে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। উভয় ভিডিওতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জুলাই ও একাত্তর নিয়ে কথা বললেও কোথাও আলোচিত দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘মোহাম্মদ বাদশা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ‘কদিন পর বলবে জুলাই যোদ্ধা বলে কিছু নাই’ ক্যাপশনে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ১৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ক্লিপে আমীর খসরুকে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের গণভোট? গণভোট বলে কিছু নাই। গণভোট বলে কোনো আলোচনার বিষয় নাই। এটা ওখানেও কোনো অ্যাজেন্ডা ছিল না। এখন গণভোটের কোনো অ্যাজেন্ডা নাই।’ তবে সেখানে জুলাই নিয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদ বাদশা নামের আইডিতে প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকে ‘কিসের গণভোট, গণভোট বলে কিছু নাই: আমীর খসরু’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। সেখানে গণভোট প্রসঙ্গে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এটি ঐকমত্য কমিশনের কোনো অ্যাজেন্ডা ছিল না, এখনও কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। যেটুকু ঐকমত্য হওয়ার হয়েছে, বিষয়টি সেখানেই শেষ।’ তবে ওই ভিডিওতেও ‘জুলাই যোদ্ধা বলে কিছু নেই’ বা ‘সংবিধান অনুযায়ী এটি অন্যায়’—এমন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যা বললেন আমীর খসরু’ শিরোনামে Banglalens24 নামের একটি ফেসবুক পেজে ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে আমীর খসরুকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা তো জুলাই সনদে সই করেছি। আমাদের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিএনপির যে উন্নয়নের রূপরেখা আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সবকিছু বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সুতরাং, ‘জুলাই যোদ্ধা বলে কিছু নাই’—এমন কোনো মন্তব্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী করেননি। আলোচিত দাবিটি সঠিক নয়।