নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এক দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত হয়েছে শিশুটির ধর্ষক আসলে তার আপন নানা। এসব পোস্টে আরও দাবি করা হয়, কোনো প্রমাণ ছাড়াই একজন আলেম বা মাদ্রাসাশিক্ষককে এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
‘Jubayer Ahmad Tasrif-জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ৫ মে রাত ৮টার দিকে আলোচিত দাবিতে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়, যা সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। আজ ৬ মে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পোস্টটিতে ৫৩ হাজার রিয়েকশন, ১০ হাজার ৫০০ কমেন্ট ও ২ হাজার ৫০০ শেয়ার রয়েছে।
ভাইরাল পোস্টের কমেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ব্যবহারকারী এই তথ্যটি বিশ্বাস করে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে সাফাই গাইছেন এবং ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে দোষারোপ করছেন। অনেকেই আবার তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই এ ধরনের বিষয় পোস্ট করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে কোনো সংবাদমাধ্যমে ওই কিশোরীর ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন হওয়া বা ধর্ষক হিসেবে অন্য কেউ শনাক্ত হওয়া সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে ৪ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের ওই শিশুটি একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসার ছাত্রী। শিশুটির মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করায় সে নানার বাড়িতে থেকে সেখানে পড়াশোনা করত।
মামলার অভিযোগ ও শিশুটির বরাত দিয়ে তার স্বজনেরা অভিযোগ করেন, গত বছরের ২ নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক মেয়েটিকে ডেকে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। এ সময় মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যান। ঝাড়ু শেষে একটি কক্ষে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে ওই শিশুকে এবং তাঁর মা ও ছোট ভাইদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে একাধিকবার শিশুটিকে ধর্ষণ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্প্রতি শিশুটি অসুস্থ বোধ করছিল এবং তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। পরে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ১৮ এপ্রিল শিশুটিকে মদন উপজেলা শহরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, শিশুটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরে এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বৃহস্পতিবার বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে আটক করেছে র্যাব-১৪। আজ বুধবার (৬ মে) ভোর ৪টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা থেকে তাঁকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ডিএনএ টেস্টের দাবির বিষয়ে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিএনএ রিপোর্টের বিষয়ে যা প্রচার করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি মিথ্যা এবং বানোয়াট। এই মামলায় আমরা এখনো কারো ডিএনএ আলামত সংগ্রহ করিনি। নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চা প্রসবের পর আদালতের নির্দেশ সাপেক্ষে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হবে।’
অর্থাৎ, ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপই যেখানে শুরু হয়নি, সেখানে ডিএনএ রিপোর্টে নানা ধর্ষক প্রমাণিত হওয়ার দাবিটি ভিত্তিহীন।
সিদ্ধান্ত
নেত্রকোনায় মাদ্রাসা ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় ‘ডিএনএ টেস্টে নানা ধর্ষক প্রমাণিত’ হওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।