সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে, এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘শেখ হাসিনার সময় তাঁদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা চালু ছিল, কিন্তু বর্তমানে তাঁরা সেই ভাতাও পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ করেন বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা।’ দাবি করা হয়, ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে তাঁরা এসব কথা বলেন।
পোস্টগুলোতে আরও আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করা হয়, ‘গোটা জাতির বুক আজ ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। তবে হৃদয়ের তীব্র দহন চেপে রাখা সম্ভব নয়—খুব শিগগিরই এর বিস্ফোরণ ঘটবে।’
এই দাবিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্ট রয়েছে এখানে , এখানে , এখানে এবং এখানে ।
‘মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ১১ মে আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি শেয়ার করা হয়। আজ (১৬ মে) বিকেল ৪টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ১ লাখ ৪ হাজারবার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া এতে ৪ হাজার ৪০০ রিঅ্যাকশন, ১০৩ কমেন্ট ও ৩৬২ শেয়ার রয়েছে। শেয়ার করা এসব পোস্টের কারণে নেটিজেনদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এক ব্যক্তি মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে, গলায় ব্যাগ ঝুলিয়ে এবং হাতে পতাকা নিয়ে ইশারায় কিছু বলার চেষ্টা করছেন। আশপাশে কয়েকজন বাঁশি বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, আর অন্যরা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভিডিওতে ‘শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা জড়ো হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে’ এবং ‘Awaz News’ লেখা রয়েছে।
এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করে ‘আওয়াজ নিউজ’-এর ফেসবুক পেজে মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। পেজটিতে একই ঘটনার অন্তত ১০টির বেশি ভিডিও পাওয়া যায়, যেগুলোর ক্যাপশনে লেখা—‘ভাতা অনেক কম, ৩ মাসে মাত্র ২৫০০ টাকা’, ‘প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা চায় শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা’, ‘পরিবহনে হাফ ভাড়া দিতে চায় প্রতিবন্ধীরা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ প্রতিবন্ধীরা ভাতা বন্ধের জন্য নয়, বরং ভাতা বৃদ্ধি ও গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়াসহ ১৫ দফা দাবিতে আন্দোলন করছিলেন।
একই বিষয়ে ‘১৫ দফা দাবিতে প্রেসক্লাবে বধিরদের মানববন্ধন’ শিরোনামে দৈনিক সমকালের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ১০ মে বেলা ২টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ওই ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘২৫০০ টাকায় আমাদের সংসার চলে না। এখন সবকিছুর দাম বেশি—তাহলে আমরা কীভাবে চলব?
ইশারা ভাষা অনুবাদকের (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার) মাধ্যমে অপর একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের দাবিগুলো যদি না মানা হয়, তাহলে “ভবিষ্যতে হবে”, “পরে হবে”—এসব আশ্বাস আমরা আর মানব না। আমরা উপদেষ্টাদের কাছেও গিয়েছিলাম, কিন্তু এভাবে টালবাহানা করে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’
বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিমের পক্ষ থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা-৩) শিলা রানী দাসের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়।
শিলা রানী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধের দাবিটি ভিত্তিহীন।’ তিনি জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় বধির ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ হয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রীও তাঁদের সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহী।
এ ছাড়া সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা আরও বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান শিলা রানী।
সিদ্ধান্ত
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধীদের ভাতা বৃদ্ধি ও ১৫ দফা দাবির একটি আন্দোলনকে ‘সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে’ দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।