জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের একটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের কথা ভাবা হচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই পদ্ধতি হিতে বিপরীত বা ‘ব্যাকফায়ার’ করতে পারে। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের পরও এই প্রযুক্তি বায়ুমণ্ডলের কার্বন কমানোর পরিবর্তে উল্টো বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
জাতিসংঘের মতে, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ’ অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই আশা করেছিলেন সামুদ্রিক শৈবাল চাষ এর একটি সস্তা সমাধান হতে পারে। এই উদ্দেশে আমেরিকার স্টার্ট-আপ ‘রানিং টাইড’ ৭০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে গভীর সমুদ্রে শৈবাল ডুবিয়ে কার্বন জমার কাজ শুরু করলেও, অর্থায়নের অভাবে গত বছর কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ডাচ কোম্পানি ‘কেল্প ব্লু’ নামিবিয়ায় শৈবাল চাষে অন্তত ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে বছরে ৫০০ মিলিয়ন টন পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোধন করা সম্ভব।
কিন্তু নতুন দুটি বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাপক আকারে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করলে তা সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন-এর পুষ্টি উপাদান কেড়ে নেবে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনও প্রাকৃতিকভাবে মারা গিয়ে সমুদ্রের তলদেশে কার্বন জমা করে। সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যানন বার্জার বলেন, ‘কিছু কিছু এলাকায় এটি সমুদ্রের কার্বন শোষণের ক্ষমতা উল্টো কমিয়ে দেবে। এর কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত এবং পরিবেশগত ঝুঁকি অনেক বেশি।’
উপকূলের বাইরে খোলা সমুদ্রে পুষ্টি উপাদান, বিশেষ করে আয়রনের অভাব থাকে। বার্জার ও তাঁর সহকর্মীদের মডেল অনুযায়ী, প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন টন শৈবাল চাষ করলে ২৫ বছরের মধ্যে সমুদ্রের নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও আয়রন শেষ হয়ে যাবে এবং শৈবালের বৃদ্ধি ৯৫ শতাংশ কমে যাবে। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বৃদ্ধি ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেবে। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি ১ টন শৈবালের কার্বনের বিপরীতে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত আধা টন কার্বন বৃদ্ধি পেতে পারে। সমুদ্রের মাত্র ০.০৫ শতাংশ এলাকা (যেমন সেনেগাল ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার উপকূল) ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের ক্ষতি না করে শৈবাল চাষের উপযোগী।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফি সেন্টারের অ্যান্ড্রু ইউল এবং তাঁর দলের আরেকটি মডেলে দেখা গেছে, কৃত্রিমভাবে আয়রন প্রয়োগ করে বছরে ৪০ বিলিয়ন টন কার্বন অপসারণ করা সম্ভব হলেও, তা সমুদ্রের প্ল্যাঙ্কটন অর্ধেক কমিয়ে দেবে। এতে মাছের খাদ্যসংকট তৈরি হবে। ইউল বলেন, ‘আমরা মূলত সমুদ্রের উপরিভাগের পুষ্টি উপাদান কেড়ে নিয়ে তা গভীরে পাঠিয়ে দিচ্ছি, যা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করে মারার শামিল।’
এ ছাড়া এই প্রক্রিয়ার জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে খাঁচা বা কাঠামো তৈরি করতে হবে। আর যদি কৃত্রিমভাবে আয়রন দেওয়া না হয়, তবে প্ল্যাঙ্কটনের ঘাটতির কারণে বায়ুমণ্ডলে উল্টো বছরে ৭০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষক চেলসি বেকার সতর্ক করে বলেছেন, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের ক্ষতির হিসাব না করে শুধু সামুদ্রিক শৈবাল চাষ করলেই কার্বন কমবে—এমনটা ভাবা ভুল।