বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘এল নিনো’ নামে পরিচিত প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র শুরু হয়েছে। এটি বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়া নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই আবহাওয়া চক্রের কারণে প্রভাবিত হবে। এর কারণে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে খরার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক পূর্বাভাস বলছে, এটি ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে।
মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কয়েক দশকের প্রভাবের ওপর নতুন করে এই পরিস্থিতি যোগ হওয়ায় ২০২৭ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে। এর ফলে আবহাওয়া, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এল নিনো তৈরি হয় প্রশান্ত মহাসাগর এবং তার ওপরের বায়ুমণ্ডলীয় অঞ্চলে। স্বাভাবিকভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাতাস যখন দুর্বল হয়ে যায় বা দিক পরিবর্তন করে, তখন উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
নোয়ার বিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মধ্য ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যাওয়ার তথ্য পর্যবেক্ষণের পর নতুন এল নিনো পর্যায় শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা আরও দেখেছেন, বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুচাপ কমে গেছে।
এদিকে, জাপান মিটিওরোলজিক্যাল এজেন্সিও জানিয়েছে, এল নিনোর পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান। কিছু বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনো অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। এর একটি বড় কারণ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের নিচের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে এই পানির তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। সাধারণত গভীর সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ পরবর্তী সময়ে পৃষ্ঠের পানিকেও আরও উষ্ণ করে তোলে। ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বা তথাকথিত ‘সুপার এল নিনো’ বলতে বোঝায়, যখন মধ্য ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে এমন ঘটনা মাত্র কয়েকবার ঘটেছে।
নোয়া জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। সংস্থাটির ভাষায়, এটি ‘১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক রেকর্ডের সবচেয়ে বড় এল নিনো ঘটনাগুলোর একটি’ হিসেবে স্থান পেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিস্থিতি অন্তত ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হবে।
এল নিনো ঘটনাটি প্রথম শনাক্ত করেন ১৬০০-এর দশকে পেরুর জেলেরা। তাঁরা এর নাম দিয়েছিলেন ‘এল নিনো দে নাভিদাদ’ (El Niño de Navidad), যার অর্থ স্প্যানিশ ভাষায় ‘খ্রিস্ট শিশু।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনো ‘খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াবে।’
এল নিনোর সময় সমুদ্র তার তাপ বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তর করে, ফলে বায়ুর তাপমাত্রা বাড়ে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে এটি যুক্ত হলে, ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।
তবে আবহাওয়ার ওপর এর নির্দিষ্ট প্রভাব নির্ভর করে আপনি পৃথিবীর কোন অঞ্চলে আছেন এবং বছরের কোন সময়ে আছেন তার ওপর। দুটি এল নিনো কখনো পুরোপুরি একরকম নয়। তবে সাধারণভাবে শক্তিশালী এল নিনো দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি করে, যা খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায়।
এটি ভারতীয় মৌসুমি বায়ুকেও দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এল নিনোর সময় পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে সাধারণত বেশি ক্রান্তীয় ঝড় তৈরি হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রসহ ক্রান্তীয় আটলান্টিক অঞ্চলে ঝড়ের সংখ্যা কমে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক জটিল এবং ভিন্নতর হতে পারে। তবে ব্রিটিশ মেট অফিস বা আবহাওয়া বিভাগের মতে, এল নিনো যুক্তরাজ্যে শীতের শুরুটা তুলনামূলক উষ্ণ এবং শেষটা বেশি ঠান্ডা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এল নিনোর পরিস্থিতি উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে। এর প্রভাব আরও কঠিনভাবে আঘাত হানবে, আরও দূরে পৌঁছাবে এবং ভয়াবহ গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।’
দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খরার কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন এক সময়ে এটি ঘটছে, যখন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সার পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে ফসল উৎপাদন কমতে পারে, খাদ্য সরবরাহ সংকুচিত হতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্যও ঝুঁকি রয়েছে। এল নিনোর সময় ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি কম পরিমাণে উপরে উঠে আসে। ফলে অ্যাঞ্চোভিসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য কমে যায় এবং মাছের উৎপাদনও হ্রাস পেতে পারে।
কিছু বিজ্ঞানী বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর তুলনা করছেন, যা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ছিল। সেই সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলে পানির সংকট দেখা দেয়, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ডসংখ্যক ঝড় তৈরি হয় এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে খরা দেখা দেয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঝড় এবং বিস্তৃত খরার এই সম্মিলিত প্রভাব, যার পেছনে অন্তত আংশিকভাবে এল নিনো কাজ করেছিল, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য সংকট তৈরি করেছিল।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানী প্যানেল ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, ১৯৫০ সালের পরের এল নিনোগুলো ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ছিল। তবে সংস্থাটি বলেছে, গাছের বলয় এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখায় যে ১৪০০ সালের পর থেকে এল নিনোর ঘনত্ব ও শক্তিতে স্বাভাবিক ওঠানামা ছিল। আইপিসিসির মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনোকে প্রভাবিত করছে এমন পরিষ্কার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে কিছু জলবায়ু মডেল ইঙ্গিত দেয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ভবিষ্যতে এল নিনোর ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হতে পারে। যদিও এটি এখনো জটিল ও অনিশ্চিত গবেষণার ক্ষেত্র এবং এ নিয়ে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই। তবে একটি বিষয়ে বিজ্ঞানীরা তুলনামূলকভাবে একমত। এল নিনোর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর যুক্ত হয়ে কাজ করবে এবং এর ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশকে ঘিরে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ এক ধরনের সতর্ক কিন্তু আতঙ্কহীন ছবিই তুলে ধরছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী তিন মাসে দেশের ওপর অন্তত ৮–১০টি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই তিন থেকে চারটি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, এল নিনোর প্রভাবে এ মৌসুমে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতের সুনির্দিষ্ট চিত্র এখনই বলা সম্ভব নয়।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে কতটা পড়বে তা নির্ভর করে এর সময় ও শক্তির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, ২০২৬ সালের মৌসুমি বৃষ্টিপাতে এর প্রভাব মাঝারি মাত্রার হতে পারে। তাঁর মতে, এল নিনো যদি গ্রীষ্মের শুরু বা মৌসুমের ঠিক আগে তৈরি না হয়ে পরে গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের ওপর এর প্রচলিত তীব্র প্রভাব—যেমন ভয়াবহ খরা বা বড় ধরনের মৌসুমি ব্যর্থতা—তেমনভাবে নাও দেখা যেতে পারে।
তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, জলবায়ু ব্যবস্থা একক কোনো ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক প্যাটার্ন মিলেই বাংলাদেশের মৌসুমি বৃষ্টি নির্ধারণ করে। তাই এল নিনো শুধু একটি সম্ভাব্য প্রভাবক, চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক নয়।
ঢাকাভিত্তিক জলবায়ু থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘অভিজ্ঞতা বলছে, এল নিনো থাকলে দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
জলবায়ুর এই টানাপোড়েনের ভেতর আরও গভীর উদ্বেগ দেখছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহা বলেন, এল নিনো থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর অভিঘাত ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। তাঁর মতে, দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে গেলে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যেতে পারে এবং নদীবাহিত সমতলভূমির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও দ্য ডেইলি স্টার