গত সোমবার দিবাগত রাত ১টায় না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন নাট্যজন আতাউর রহমান। বাংলাদেশের নাট্যজগতে আতাউর রহমান এক অনবদ্য নাম। তিনি একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক ও লেখক। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। মঞ্চনাটকে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন আতাউর রহমান। নাট্যজনের প্রয়াণে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা—
আবুল হায়াত অভিনেতা, নির্দেশক
চট্টগ্রামে একই স্কুলে পড়েছি আমরা। আতা ভাই (আতাউর রহমান) আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছিলেন। এরপর ঢাকায় নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে তাঁকে পেলাম। একসঙ্গে দীর্ঘ একটা পথ আমরা পাড়ি দিয়েছি।
মঞ্চনাটকের দলের বেশি সময় কাটে রিহার্সালে। সেই রিহার্সালে আমাদের প্রতিদিন দেখা হয়, নাটকের বাইরেও গল্প হয়। অসংখ্য স্মৃতি জমা হয়। এভাবেই আতা ভাইয়ের সঙ্গেও বহু বছরের সম্পর্ক। অনেক স্মৃতি জমে আছে। সেসব স্মৃতি ফেলে তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। তাঁর প্রয়াণের খবরে মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।
মঞ্চের প্রাণপুরুষ ছিলেন আতাউর রহমান। মঞ্চ নাটকের জন্য অনেক অবদান রেখে গেছেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু মঞ্চের জন্য দিয়ে গেছেন তিনি। একসময় চাকরি করতেন। সেই চাকরি ছেড়ে নাটকের দলের জন্য সময় দেন। একটা জীবন তিনি মঞ্চের জন্য দিয়ে গেছেন, নাটকের জন্য দিয়ে গেছেন।
ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। পাণ্ডিত্য ছিল খুব। প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁর ছিল অনেক পড়াশোনা। মঞ্চে তাঁর নির্দেশনাগুলো অসাধারণ। নিজের কাজ দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।
মামুনুর রশীদ অভিনেতা, নির্দেশক
দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা। বিপদে-আপদে, সুদিনে সংকটে একসঙ্গে ছিলাম। আতাউর রহমান খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন। তিনি একাধারে নাট্যশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন। আমরা যখন নাট্যচর্চা শুরু করি, তখন আমাদের কিছুই ছিল না। আমাদের মঞ্চ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, ব্রিটিশ কাউন্সিলে নাটক করেছি। এরপর মহিলা সমিতিতে নাটক শুরু হয়। সেখানে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছি। উনিও অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। মঞ্চে দর্শক বাড়ানোর লড়াইয়ে তাঁর অনেক অবদান। উনি খুব নিষ্ঠাবান নাট্যকর্মী ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। এ কারণে তিনি ‘রক্তকরবী’ করেছেন। এটি ছিল অত্যন্ত সাড়া জাগানো ও প্রশংসিত একটি নাটক। এ ছাড়া তিনি ‘গ্যালিলিও’সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এসব কাজই তাঁকে মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর নাটকও তিনি করেছেন। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়ায় আমরা শোকাহত। আমরা একজন আপনজনকে হারালাম।
সহকর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তবে আমাদের মাঝে ভুল-বোঝাবুঝি বা মনোমালিন্যও হয়েছে। আবার সেটা ভুলেও গেছি। এত বছরের পথচলায় কত শত স্মৃতি তাঁর সঙ্গে। কত কথা মনে পড়ছে। সবকিছু ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। তাঁর প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রইল।
তিনি ভেতরে যে রকম, সামনেও তা-ই ছিলেন
তারিক আনাম খান অভিনেতা, নির্দেশক
আতাউর রহমান মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবেই দেখতেন। জীবন একসময় শুরু হবে, কাজ করতে হবে, এরপর একসময় চলে যেতে হবে—এসব আতা ভাইয়ের কাছ থেকে শেখা। আমার সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। আমার নির্দেশিত কাজ তিনি দেখতেন। দেখার পর সেগুলো নিয়ে লিখতেন। বিষয়টি আমার জন্য বিশাল স্মৃতি হয়ে থাকবে। তিনি তাঁর লেখায় এমনভাবে সমালোচনা করতেন, সেগুলো নিয়ে আমরা ভাবতাম। এটা খুব মিস করব।
নাট্যজন আতাউর রহমানের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—তিনি ভেতরে যে রকম, সামনেও তা-ই। তাঁর মাঝে কখনো কোনো রকম ভণ্ডামি দেখিনি। যদি ভালো না লাগে তাহলে বলতেন, ভালো লাগেনি। ভালো লাগলে খুব উচ্ছ্বসিত হতেন। তাঁর সঙ্গে নাটক নিয়ে অনেক কথা হতো আমার। দেখা হলেই জোয়ান মর্দ পোলা বলে সম্বোধন করতেন। খুব মজার সম্পর্ক ছিল আমাদের।
এ রকম মানুষগুলো চলে যাচ্ছে, এটা খুব কষ্টের। এই ক্ষতি পূরণ হবে না কোনো দিন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। উনি খুব একাকী হয়ে গিয়েছিলেন। মনঃকষ্টের মাঝে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। তাঁর ওই কষ্টের মুখ দেখতে হয়নি, এটা আমার জন্য ভালো হয়েছে। আগের সেই জীবন্ত অফুরান শক্তিওয়ালা আতাউর রহমানকে মনে রাখতে চাই আজীবন।
জন্ম: ১৯৪১ সালের ১৮ জুন, নোয়াখালী জেলার শইল্যাঘাটিয়া গ্রামে, নানাবাড়িতে।
মা-বাবা: পৈতৃক নিবাস নোয়াখালী জেলার আমিরাবাদ গ্রাম। পিতা মাহবুবুর রহমান, মাতা জাহানারা বেগম।
শৈশব-কৈশোর: বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব কেটেছে কলকাতায়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে মা-বাবার সঙ্গে চট্টগ্রামে চলে আসেন। ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে।
পড়াশোনা: চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি ও ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি পাস করেন।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা: কবি ও নাট্যব্যক্তিত্ব জিয়া হায়দারের সঙ্গে মিলে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়।
প্রথম নির্দেশনা: ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’।
নির্দেশিত আরও উল্লেখযোগ্য নাটক: মাইলপোস্ট, সাজাহান, ব্যারি দ্য ডেড, ওয়েটিং ফর গডো, গ্যালিলিও, মাদার কারেজ, ঈর্ষা, গণনায়ক, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, মার্চেন্ট অব ভেনিস, তাসের দেশ, রক্তকরবীসহ ২৪টি নাটক।
অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক: বাকি ইতিহাস, ম্যাকবেথ, সৎ মানুষের খোঁজে, দেওয়ান গাজীর কিসসা, নূরলদীনের সারাজীবন, অচলায়তন, রক্তকরবী, গান্ধারীর আবেদন ইত্যাদি।
পুরস্কার: একুশে পদক (২০০১), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১)সহ অনেক সম্মাননা।
প্রকাশিত বই: প্রজাপতি নিবন্ধ, মঞ্চসারথির কাব্যকথা, নাটক করতে হলে, নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা, পাদপ্রদীপের আলোয় ইত্যাদি।
মৃত্যু: ১২ মে ২০২৬, ঢাকা।