যুদ্ধের আবহে অস্কারের আসর। ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত শপিং সেন্টার ওভেশন হলিউডের ডলবি থিয়েটারে ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত অস্কারের অনুষ্ঠান করে দ্য একাডেমি। স্থানীয় সময় ১৫ মার্চ রাতে যখন সেখানে অস্কারের ৯৮তম আসর বসেছিল, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে তখনো চলছিল যুদ্ধ। তারকাখচিত আয়োজনে, ঝলমলে উৎসবে সে যুদ্ধের মলিনতা ঢেকে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিল দ্য একাডেমি। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো কই!
যুদ্ধের আবহে অস্কারের আয়োজন, তাই বাড়তি সতর্ক ছিল দ্য একাডেমি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের যাবতীয় বিধিনিষেধ পেরিয়ে ঠিকই নিজের প্রতিবাদ জানিয়ে দিয়েছেন স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম। বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম বিভাগের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে এসে অস্কারের মঞ্চে ভারতীয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পাশে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘নো টু ওয়ার অ্যান্ড ফ্রি প্যালেস্টাইন’। অনেকক্ষণ করতালি দিয়ে হাভিয়ের বারদেমের এই প্রতিবাদের সমর্থন জানান উপস্থিত অতিথিরা।
হাভিয়ের বারদেমের পোশাকেও ছিল যুদ্ধবিরোধী স্লোগান। ফিলিস্তিনের পক্ষে বিশেষ ব্যাজ পরে এসেছিলেন। আরেকটি ব্যাজে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘নো টু ওয়ার’। রেড কার্পেটে সংবাদমাধ্যমকে হাভিয়ের বারদেম বলেন, ‘এই ব্যাজ আমি ২০০৩ সালেও পরেছিলাম। তখন ইরাকের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে আগ্রাসন চলছিল। ২৩ বছর পর আরেকটি অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই ব্যাজ পরেছি। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আবারও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন। অস্কার সিনেমার উদ্যাপনের মঞ্চ হলেও এটি যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ। তাই অন্যায় যুদ্ধ ও হত্যার বিরুদ্ধে এখানে আমার প্রতিবাদ জানালাম।’
এ ছাড়া, ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্ম বিভাগের বিজয়ী ‘মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’ সিনেমার নির্মাতা পাভেল তালাঙ্কিনও যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য রাখেন। পুরস্কার হাতে নিয়ে অস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আমাদের সন্তানদের কথা চিন্তা করে সমস্ত যুদ্ধ এখনই বন্ধ করা উচিত।’
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদারের ছক্কা
সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য—৯৮তম অস্কারে প্রধান এই তিন বিভাগসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কার জিতল ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। যদিও আশ্চর্যজনকভাবে হাতছাড়া হলো সেরা অভিনেতা বিভাগে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর পুরস্কারটি। ‘সিনারস’ সিনেমায় অভিনয় করে এই অর্জন নিজের করে নিলেন মাইকেল বি জর্ডান।
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার সিনেমার নেপথ্যের মানুষটি পল থমাস অ্যান্ডারসন। গত বছরের পুরোটা সময় এবং এখনো যাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, উন্মাদনা চলছে চলচ্চিত্র দুনিয়ায়। ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদারের মতো একটি ‘অন্য রকম’ সিনেমা বানিয়ে যিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাদের আসল রাজনৈতিক ইতিহাস। সন্তানদের জন্য এই পৃথিবী যে কতটা প্রতিকূল, সেই বাস্তব চিত্র আবারও উসকে দিয়েছেন প্রতিটি মানুষের মনে। অস্কারের আসরেও সেই পল থমাস অ্যান্ডারসনকে নিয়ে দেখা গেল অন্য রকম উন্মাদনা।
অস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পল থমাস অ্যান্ডারসন বললেন, ‘এ সিনেমাটি আমি আমার বাচ্চাদের জন্য লিখেছি। তাদের প্রতি সরি বলতে, এই পৃথিবীতে যেসব জঞ্জাল আমরা রেখে যাচ্ছি, তাদেরকে দিয়ে যাচ্ছি—এ জন্য দুঃখপ্রকাশ করতে। সেই সঙ্গে এই আশাও আছে যে, তারা হবে সেই প্রজন্ম, যারা আমাদের ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান ও শালীনতা শেখাবে।’
কী আছে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায়
‘ফ্রেঞ্চ সেভেন্টি ফাইভ’ নামের এক অতিবামপন্থী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ দেখা যায় সিনেমাটির শুরু থেকেই। সেই গোষ্ঠীর এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট প্যাট, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। দলের নায়িকা পার্ফিডিয়া (টেয়ানা টেইলর)। আমেরিকায় এখন যাকে বলে ‘আইসিই ক্যাম্প’, যেখানে অবৈধ অভিবাসীদের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হয়; সে রকম একটি সরকারি আধা-মিলিটারির বিরুদ্ধে তাদের লড়াই। তারা ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে বন্দীদের মুক্ত করে।
প্যাট আর পার্ফিডিয়া ভালোবাসে পরস্পরকে। কিন্তু গল্পের এক চরম মুহূর্তে পার্ফিডিয়া ধরা দিতে বাধ্য হয় কর্নেল লকজ নামের এক মিলিটারি অফিসারের কাছে। লকজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শন পেন। লকজ সাম্প্রদায়িক বর্ণবিদ্বেষী মানুষ। যে জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি তার ঘৃণা, সেই জনগোষ্ঠীর নারীদের প্রতি সে তীব্র যৌন-আকর্ষণ বোধ করে।
পার্ফিডিয়া ধরা পড়ে এক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায়। তার কাছ থেকে পুরো দলের তথ্য নেয় লকজ। ফ্রেঞ্চ সেভেন্টিফাইভ গ্রুপের সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করে মিলিটারি পুলিশ। প্যাট তার সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। খুঁজে নেয় ভিন্ন নাম ও ভিন্ন পরিচয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই কন্যাটি কার? প্যাটের না লকজের?
এ প্রশ্ন মোটেই উদ্বিগ্ন করে না প্যাটকে। কিন্তু লকজকে তাড়িত করে। ১৬ বছর পরে। কর্নেল লকজের তীব্র ইচ্ছা ক্রিসমাস অ্যাডভেঞ্চারার্স নামের একটি গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার। কিন্তু এই উচ্চমার্গের শ্বেতাঙ্গ রেসিস্ট গোষ্ঠীর নেতারা যদি জানতে পারে, তার একটি বাইরেসিয়াল অবৈধ সন্তান আছে; তাহলে বিপদ। অতএব সে ওই বাবা ও মেয়ের খোঁজ শুরু করে। তার উদ্দেশ্য, ডিএনএ টেস্টে যদি বের হয় উইলা তার সন্তান, তাহলে তাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবে।
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার সিনেমার শেষে সেই মিশ্রবর্ণের কন্যাটি হয়ে যায় আমেরিকার আত্মা। তার পিতা কে হবে? একজন ফ্যাসিস্ট বর্ণবিদ্বেষী? নাকি একজন পরাজিত বিপ্লবী? যে বিপ্লবী এখনো মনে করে, অভিবাসীদের হাত ধরে যে দেশ গঠিত হয়েছিল, সেই দেশে নির্দিষ্ট কোনো বর্ণকে কোনোভাবেই প্রাধান্য বিস্তার করতে দেওয়া যায় না। সেই লড়াই এখনো চলছে। ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার...।
অস্কারে সেরা হলেন যাঁরা
সিনেমা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
পরিচালক: পল থমাস অ্যান্ডারসন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
অভিনেতা: মাইকেল বি জর্ডান (সিনারস)
অভিনেত্রী: জেসি বাকলি (হ্যামনেট)
পার্শ্ব অভিনেতা: শন পেন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
পার্শ্ব অভিনেত্রী: অ্যামি ম্যাডিগান (ওয়েপনস)
অ্যাডপ্টেড স্ক্রিনপ্লে: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (চিত্রনাট্যকার: পল থমাস অ্যান্ডারসন)
অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে: সিনারস (চিত্রনাট্যকার: রায়ান কুগলার)
অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম: কে-পপ ডেমন হান্টারস
অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম: দ্য গার্ল হু ক্রাইড পার্লস
পোশাক পরিকল্পনা: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
অভিনয়শিল্পী নির্বাচন: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্ম: দ্য সিঙ্গারস এবং টু পিপল এক্সেঞ্জিং স্যালাইভা
রূপসজ্জা ও চুলসজ্জা: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
অরিজিনাল সং: গোল্ডেন (কেপপ ডেমন হান্টারস)
অরিজিনাল স্কোর: সিনারস
চিত্রগ্রহণ: সিনারস (চিত্রগ্রাহক: অটাম ডুরাল্ড আরকাপাও)
ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্ম: মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন
ডকুমেন্টারি শর্ট ফিল্ম: অল দ্য এম্পটি রুমস
সম্পাদনা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (নরওয়ে)
প্রোডাকশন ডিজাইন: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
সাউন্ড: এফ ওয়ান
ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট: অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ