শ্রদ্ধাঞ্জলি
৯২ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক শংকর। বাংলাদেশের যশোরে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিকের কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা। সেসব কাহিনি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৈরি হয়েছে বেশ কিছু আলোচিত সিনেমা। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে তপন সিংহ, বিমল রায়, বাসু চট্টোপাধ্যায়, সৃজিত মুখার্জির মতো নির্মাতারা সিনেমা বানিয়েছেন শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে। বড় পর্দা, ছোট পর্দা থেকে মঞ্চ—শংকরের লেখা আলো ছড়িয়েছে সর্বত্র।
১৯৬৮ সালে শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে প্রথম সিনেমা বানান পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায়। ‘চৌরঙ্গী’ নামের সিনেমাটিতে স্যাটা বোস চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল। তত দিনে সাহিত্যিক হিসেবে শংকরের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল, এ সিনেমার জনপ্রিয়তা তাঁকে আরও পরিচিতি এনে দেয়। পুরান কলকাতায় শাজাহান রিজেন্সি নামের এক পাঁচ তারকা হোটেলকে ঘিরে চৌরঙ্গী সিনেমার গল্প। তৎকালীন আর্থসামাজিক সিঁড়িভাঙার দলিল যেন এই গল্প। এ সময়ের জনপ্রিয় পরিচালক সৃজিত মুখার্জিও এ গল্প নিয়ে কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে বানিয়েছেন ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ নামের সিনেমা।
সত্তরের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা-ত্রয়ীর দুটি সিনেমাই শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে। একটি ‘জন-অরণ্য’, অন্যটি ‘সীমাবদ্ধ’। শোনা যায়, ১৯৭৩ সালে যেদিন দেশ পত্রিকার পূজা সংখ্যায় ‘জন-অরণ্য’ প্রকাশিত হয়, সেদিনই শংকরকে এটি নিয়ে সিনেমা বানানোর প্রস্তাব দেন সত্যজিৎ। জন-অরণ্যে উঠে এসেছে সত্তরের দশকের কলকাতার মধ্যবিত্ত তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব এবং মূল্যবোধের ভাঙনের কথা। কেন্দ্রীয় চরিত্র সোমনাথ, যে চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবসার অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়ে অবশেষে একটি সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন প্রদীপ মুখোপাধ্যায়। এটিকে সত্যজিতের কলকাতা-ত্রয়ীর সেরা সিনেমা বলে মনে করা হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ পরিচালিত সীমাবদ্ধ। এ সিনেমার একদিকে রয়েছে সমকালীন সমস্যা থেকে গা বাঁচানো এলিট বাঙালি, অন্যদিকে শহরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই সিনেমা সেই সময়ের করপোরেট জগতের এমন কিছু দিকের ওপর আলো ফেলেছে, পুঁজিবাদের দাপটে ব্যক্তি চরিত্রের পতনের কথা বলেছে, যা আজও সমসাময়িক। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন বরুন চন্দ, শর্মিলা ঠাকুর প্রমুখ।
শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে প্রখ্যাত পরিচালক তপন সিংহ ১৯৭৭ সালে তৈরি করেন ‘এক যে ছিল দেশ’। সিনেমার মূল ভূমিকায় দীপঙ্কর দে ও সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। আরও ছিলেন ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনিল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ব্যঙ্গাত্মক এ সিনেমায় দেখানো হয়েছে, এক তরুণ বিজ্ঞানী এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করেন, যা সেবন করলে মানুষ সত্য কথা বলতে বাধ্য হয়। এ গল্পের আড়ালে সমাজ ও রাজনীতির অসত্য, দুর্নীতি ও ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছেন শংকর।
১৯৮৭ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয় ‘সম্রাট ও সুন্দরী’। মুখ্য ভূমিকায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেবশ্রী রায়। ধনীর সন্তানের প্রেম দরিদ্র পরিবারের মেয়ের সঙ্গে, তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন গল্পের মূল আকর্ষণ।
বাংলা পেরিয়ে শংকরের সৃষ্টি পাড়ি দিয়েছিল বলিউডেও। ১৯৮৬ সালে শংকরের লেখা ‘মান সম্মান’ উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালক বাসু চট্টোপাধ্যায় বানিয়েছিলেন হিন্দি সিনেমা ‘সিসা’। জুটি বেঁধেছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী ও মুনমুন সেন। করপোরেট দুনিয়ার অন্ধকার দিক উঠে এসেছিল এ সিনেমায়।