দেশের উচ্চশিক্ষা খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। এসব প্রসঙ্গসহ উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা, কারিকুলাম সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন উত্তরা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখা।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ‘লার্নিং গ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি বিপাকে পড়ছে?
এটি খুবই বাস্তব সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন ভর্তি হয়, তখন আমরা ধরে নিই, তার মৌলিক ভাষাগত দক্ষতা, গাণিতিক দক্ষতা, সাধারণ জ্ঞান, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি এবং নতুন ধারণা গ্রহণের ক্ষমতা একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ধারণা অনেকটা ভুল প্রমাণিত হয়। দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় আসা অনেক শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শেখা ও বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন শুধু উচ্চশিক্ষা দেওয়ার কাজই নয়, শিক্ষার্থীদের সেই ঘাটতি পূরণ করে তাদের ভিত্তি শক্ত করার দায়িত্বও নিতে হয়। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়, অর্থ ও মানবসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিষয়টি এখন আর ভাবনার পর্যায়ে নেই; আমরা ইতিমধ্যে বাস্তবায়নে নেমেছি। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেই ভাবনা থেকে আমরা নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য জেনারেল এডুকেশনের আওতায় ব্রিজ কোর্স, ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম এবং ইংরেজি ও গণিত দক্ষতা উন্নয়নমূলক ক্লাস পরিচালনা করছি। পাশাপাশি সফট স্কিল প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। কারণ, আমাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করা। এ জন্য তাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক। কারণ, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পাইপলাইন যদি দুর্বল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে তার প্রভাব পড়বে। তবে এটিকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, সেই কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ, সমস্যার উৎস চিহ্নিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়েছে, তাদের দুর্বলতা শনাক্ত করে পুনরায় পরীক্ষার জন্য কার্যকরভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করে শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি কোনো টেকসই সমাধান নয়।
অবশ্যই এসেছে। আমাদের কারিকুলামকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক, সমস্যা সমাধানমুখী, প্রযুক্তিসচেতন এবং বাস্তব জীবনমুখী হতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে এই ব্যবধান থেকেই যাবে। তাই জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাবিদ, শিল্প খাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবা খুব জরুরি।
আমাদের লক্ষ্য একটাই—বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে উত্তরা ইউনিভার্সিটির নাম উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষের জন্য পরিচিত হবে।
এ বছর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ফর ইনোভেশনসের (উরি) বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমরা ১৯৩তম স্থান অর্জন করেছি, যা গত বছরের তুলনায় ৬৪ ধাপ অগ্রগতি। পাশাপাশি স্টুডেন্ট সাপোর্ট অ্যান্ড এনগেজমেন্ট ক্যাটাগরিতে বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময় শিক্ষার্থীরাই থাকে। আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা পেশাজীবী হিসেবে যেমন সফল হবে, তেমনি সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে।
আমি এটিকে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দায়িত্ব হিসেবে দেখতে পছন্দ করি। আমার এই অবস্থানে আসা প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে নারীরা নেতৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। আমি চাই, ভবিষ্যতে ‘নারী উপাচার্য’ শব্দবন্ধটি আলাদা করে উচ্চারণ করার প্রয়োজন না থাকুক। আরও বেশি নারী শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেতৃত্বে আসুন, সেটিই আমার প্রত্যাশা। আমাদের সমাজে নারীর সম্ভাবনা অসীম; প্রয়োজন শুধু সুযোগ ও আস্থার।