টিউশন ফি বৃদ্ধি, সেশনজট, ভর্তি জটিলতা, আধুনিক গবেষণাগারের অভাব, বাংলায় পাঠদান ও ইন্টারনেট সমস্যাসহ নানা অব্যবস্থাপনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা। স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।
অন্যদিকে, ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেন সেলের স্থায়ী কার্যালয় না থাকা, লোকবল সংকট এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনার অভাবকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬–১৭ থেকে ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত পিএইচডি, এমফিল, মাস্টার্স ও স্নাতক পর্যায়ে মোট ৭২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৬ জন কোর্স সম্পন্ন করেছেন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছেন ২০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী।
শিক্ষাবর্ষভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষে সাতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে তিনজন পড়াশোনা শেষ করেন। ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষে ২২ জন ভর্তি হয়ে কোর্স সম্পন্ন করেন ১৬ জন। ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ১৬ জন, তাঁদের মধ্যে সাতজন এবং ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১০ জন কোর্স সম্পন্ন করেন।
এরপর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে একজন, ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে ছয়জন, ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষে একজন এবং ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে তিনজন ভর্তি হন। ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। তবে ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে এমফিল পর্যায়ে ভর্তি হয়েছেন দুজন।
স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া ৩১ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ জনের পড়াশোনা অসমাপ্ত রয়েছে, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ ছাড়া মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া ২৮ জনের মধ্যে পাঁচজন, পিএইচডিতে আটজনের মধ্যে চারজন এবং এমফিলে ভর্তি হওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ২০ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের চারজন, ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের আটজন, ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের একজন, ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের ছয়জন এবং ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের একজন রয়েছেন। তাঁরা নেপাল, নাইজেরিয়া, ভারত ও গাম্বিয়ার নাগরিক।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভর্তির সময় যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাস্তবে তার অর্ধেকও তাঁরা পান না। সেশনজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা শেষ করতে না পারায় ভিসার মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অধিকাংশ ক্লাস বাংলায় হওয়ায় ভাষাগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। পাশাপাশি হলের মানসম্মত খাবার, পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং এবং সময়মতো ফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
গাম্বিয়া থেকে আসা ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালিমা জাল্লে বলেন, ‘আর্থিক চাপ ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের জন্য যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ ও সামাজিকভাবে মিশে যাওয়ার সুযোগও নেই। সংকট কাটাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক বৃত্তি, আন্তঃসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং একটি কার্যকর ফরেন অ্যাফেয়ার্স সেল চালুর প্রয়োজন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন সেলের কর্মকর্তা শাহদৎ হোসেন বলেন, ‘লোকবল ও অবকাঠামোর সংকটে ফরেন সেল কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। দেশীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বেশি, হল ফি প্রায় ছয় গুণ। হলের মান, আলাদা ডাইনিং ও টিউটরের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের ভোগান্তি বাড়ছে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কোনো আবেদন পড়েনি। চলতি শিক্ষাবর্ষে আর এমফিল-মাস্টার্সে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মেদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পুরোনো প্রশাসন ভবনে বড় পরিসরে ফরেন সেলের স্থায়ী কার্যালয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অগ্রগতি নিশ্চিতে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে এমফিল ও পিএইচডিতে ছয়জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে নবনির্মিত যেকোনো একটি ভবনে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হবে।’
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘ভর্তি জটিলতা, বাংলায় পাঠদান ও ইন্টারনেট সমস্যার বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। তবে শিগগিরই এসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’