শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া অথবা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা এবং দক্ষতা সৃষ্টি করে উপার্জনক্ষম করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য তিন বছর মেয়াদি ‘বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ সব কথা জানা গেছে।
সূত্র বলছে, প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৩৮ হাজার ৪০০ শিশু-কিশোরকে প্রাথমিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে খরচ হবে ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার অর্থায়ন করবে ১৪৭ কোটি ৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। আর বাকি ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা সহায়তা হিসেবে দেবে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, দেশে কর্মরত জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৯ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আবার অনেক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শহরের বস্তি, গ্রামের চরাঞ্চল, হাওর এবং পাহাড়ি এলাকা ও অভিবাসী পরিবারগুলোর শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘অনেক শিশু কাজ করার পাশাপাশি পড়তে চায়। তাদের কথা চিন্তা করেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।’
পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানা যায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই)।
প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুসারে, ৬৪ জেলার নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এতে উপকৃত হবে ৩৮ হাজার ৪০০ শিশু-কিশোর। তাদের মধ্যে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ জন বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হবে, যার অন্তত ৫০ শতাংশ হবে মেয়েশিশু। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
একই সঙ্গে নিরক্ষর, অর্ধশিক্ষিত অথবা অষ্টম শ্রেণির নিচে স্কুল ছাড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১৯ হাজার ২০০ জন প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া কিশোর-কিশোরী এবং তরুণ-তরুণীকে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে। এ জন্য প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫ কোটি ৯৯ লাখ ৩ হাজার টাকা।
প্রকল্পের মনিটরিং, রিপোর্টিং এবং মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ের জরিপ কার্যক্রমে বাকি অর্থ ব্যয় হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল রোববার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঝরে পড়া এবং শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এ উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সহায়তা করবে।’
প্রকল্প প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১০-১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য হলো উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের এমন অবস্থায় আনা, যাতে তারা চাইলে আবার আনুষ্ঠানিক স্কুল ব্যবস্থায় ফিরতে পারে। অন্যদিকে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা শিখিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূলধারায় যুক্ত করা।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘প্রকল্প নিলে শুধু সংখ্যা নয়, গুণগত দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা সত্যিই কি পরবর্তী ধাপে যেতে পারছে?–এটি নিশ্চিত না হলে বিকল্প শিক্ষা কার্যকর হয় না।’