অস্ট্রেলিয়ার উলনগং হাসপাতালে সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ডা. সাবরিনা আনোয়ার। বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায় এবং চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলেন নিজের ক্যারিয়ার। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।
বাংলাদেশে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে স্নাতকোত্তর করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন করোনা মহামারি চলছিল। সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিতে স্নাতকোত্তর শুরু করি।
কোর্সের অংশ হিসেবে বার্টস হেলথ এনএইচএস ট্রাস্টে ক্লিনিক্যাল প্লেসমেন্টের সুযোগ পাই। সেখানে চিকিৎসকদের কাজের ধরন, রোগীকেন্দ্রিক সেবা, দলগত কাজ এবং পেশাদার কর্মসংস্কৃতি খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়। এটি আমাকে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থায় ক্যারিয়ার গড়ার অনুপ্রেরণা দেয় এবং একই সঙ্গে চিকিৎসা গবেষণার প্রতিও আগ্রহী করে তোলে।
এরপর লাইসেন্সিং পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। প্রায় এক বছরের মধ্যে সব পরীক্ষা সম্পন্ন করে জিএমসি রেজিস্ট্রেশন অর্জন করি এবং যুক্তরাজ্যে ফাউন্ডেশন ইয়ার-২ (এফওয়াই২) প্রশিক্ষণের সুযোগ পাই।
এফওয়াই২ সম্পন্ন করে অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নিই। কারণ, অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসকদের কর্মজীবনের ভারসাম্য, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ তুলনামূলক ভালো। জীবনযাত্রার মানও উন্নত। যুক্তরাজ্যের তুলনায় আয় বেশি, আর জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম। দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য তাই অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কাজের জন্য একাধিক পাথওয়ে রয়েছে। কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে কোথা থেকে এমবিবিএস করেছেন, কোথায় কাজ করেছেন এবং আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর। মূলত তিনটি প্রধান পাথওয়ে রয়েছে।
প্রথমটি স্ট্যান্ডার্ড পাথওয়ে। এটি তাঁদের জন্য, যাঁরা কম্পিটেন্ট অথরিটি দেশের অন্তর্ভুক্ত নন। এ ক্ষেত্রে সাধারণত অস্ট্রেলিয়ান মেডিকেল কাউন্সিলের (এএমসি) পরীক্ষা (পার্ট-১ ও ২) পাস করে অস্ট্রেলিয়ান হেলথ প্র্যাকটিশনার রেগুলেশন এজেন্সিতে (এএইচপিআরএ) নিবন্ধনের আবেদন করতে হয়।
দ্বিতীয়টি কম্পিটেন্ট অথরিটি পাথওয়ে। আমি এই পথ অনুসরণ করেছি। এটি যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা নিউজিল্যান্ডের মতো স্বীকৃত দেশের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা অর্জনকারীদের জন্য। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে এএইচপিআরএতে আবেদন করতে হয়। এরপর নির্ধারিত সময় তত্ত্বাবধানে কাজ সফলভাবে শেষ করলে জেনারেল রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায়।
তৃতীয়টি স্পেশালিস্ট পাথওয়ে। এটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অস্ট্রেলিয়ান স্পেশালিস্ট কলেজে আবেদনকারীর যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। সব পাথওয়ের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং এএইচপিআরএর অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। সর্বশেষ তথ্যের জন্য এএইচপিআরএর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট দেখা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
অস্ট্রেলিয়ান মেডিকেল কাউন্সিল পরীক্ষার দুটি ধাপ রয়েছে। পার্ট-১ (সিএটি এমসিকিউ) এবং পার্ট-২ (ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট)। এএমসি পার্ট-১ একটি কম্পিউটারভিত্তিক এমসিকিউ পরীক্ষা। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বছরে ১০টি পরীক্ষা হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পিয়ারসন ভিউ টেস্টিং সেন্টারে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে এএমসি পার্ট-১ পরীক্ষার ফি ২ হাজার ৯২০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। তবে সময়ের সঙ্গে ফি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া উচিত।
পরীক্ষার জন্য আবেদন করার আগে অবশ্যই একটি ইপিআইসি অ্যাকাউন্ট এবং একটি এএমসি অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। পাশাপাশি ইপিআইসির মাধ্যমে মেডিকেল ডিগ্রি ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন করতে হয়।
বেশির ভাগ পরীক্ষার্থী এএমসি পার্ট-১ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ৪ থেকে ৬ মাস সময় দেন। প্রস্তুতির জন্য এএমসি হ্যান্ডবুক অব মাল্টিপল চয়েজ কোয়েশ্চেনস, দ্য এএমসি অনলাইন ট্রায়াল এক্সাম এবং সফল পরীক্ষার্থীদের ইউটিউব ভিডিও বেশ সহায়ক। এএমসি পার্ট-১ পাস করে অস্ট্রেলিয়ায় উপযুক্ত চাকরি নিশ্চিত করার পর পার্ট-২-এর জন্য নিবন্ধন করা যায়।
সাধারণ নিবন্ধনের জন্য পার্ট-২ সম্পন্ন করার দুটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো এএমসি পার্ট-২ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা। এটি ওএসসিই পদ্ধতিতে নেওয়া হয় এবং শুধু অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয়টি হলো ওয়ার্কপ্লেস-বেজড অ্যাসেসমেন্ট (ডব্লিউবিএ)। এটি অস্ট্রেলিয়ার স্বীকৃত কোনো হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় সম্পন্ন করা যায়। ডব্লিউবিএ প্রোগ্রামে সুযোগ পাওয়া বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। তবে অনেক আন্তর্জাতিক মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট (আইএমজি) এএমসি পার্ট-২ পরীক্ষার পরিবর্তে এই পথ বেছে নিয়ে সফলভাবে জেনারেল রেজিস্ট্রেশন অর্জন করেছেন।
আমি এমবিবিএস সম্পন্ন করেছি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ থেকে। যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করিনি, তাই সে বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবে কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের এমবিবিএস শিক্ষার তাত্ত্বিক ভিত্তি বেশ শক্তিশালী। চিকিৎসকের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে সেবা দেওয়ার দক্ষতা গড়ে ওঠে।
তবে অস্ট্রেলিয়ায় রোগীকেন্দ্রিক সেবা, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, বহুশাস্ত্রীয় দলীয় কাজ এবং কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোগীর নিরাপত্তা, ক্লিনিক্যাল গভর্ন্যান্স ও নিয়মিত ফিডব্যাকের সংস্কৃতিও বেশ শক্তিশালী।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে প্রথমে ভালো একাডেমিক ফল এবং আইইএলটিএসে ভালো স্কোর দরকার। পাশাপাশি ভর্তি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পার্সোনাল স্টেটমেন্ট ও আর্থিক পরিকল্পনা আগে থেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।
আমার পরামর্শ হলো, এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে নিজেই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে খোঁজ নিন। খরচ কম শুনে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে পরে হতাশ হতে পারেন। তাই তথ্য যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করুন। প্রয়োজনে এজেন্সির সহায়তা নিতে পারেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনারই হওয়া উচিত।
আমার অভিজ্ঞতায় যুক্তরাজ্যে স্নাতকোত্তর করা ছিল জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত। এটি শুধু একটি ডিগ্রি দেয়নি; বরং আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। ফলে নতুন দেশে কাজ শুরু করাও অনেক সহজ হয়েছে।
যদিও স্নাতকোত্তর সরাসরি চাকরি নিশ্চিত করে না, তবে এটি সিভিকে শক্তিশালী করে। পাশাপাশি গবেষণাপদ্ধতি, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং মৌলিক গবেষণার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে অত্যন্ত মূল্যবান। স্নাতকোত্তরে অর্জিত সেই গবেষণার অভিজ্ঞতা আমাকে পরে যুক্তরাজ্যে এফওয়াই২ ট্রেনি হিসেবে কাজ করার সময় কয়েকটি কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট পরিচালনায় সহায়তা করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এএইচপিআরএ নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করা।
অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব রাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। সবচেয়ে বড় কমিউনিটিগুলোর একটি সিডনিতে। শহরটির লাকেম্বা, পারামাত্তা ও পাঞ্চবলে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশির বসবাস। এ ছাড়া মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, পার্থ ও অ্যাডিলেডেও বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশটির ছোট-বড় প্রায় সব শহরে বাংলাদেশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা বসবাস করছেন। তাই অস্ট্রেলিয়ার যেকোনো শহরে বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগের সুযোগ পাওয়া যায়।
শুধু এএমসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। পরীক্ষার পাশাপাশি ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার ব্যবহার ও টাইপিংয়ের দক্ষতা বাড়ান। অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগাযোগ দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। রোগী, রোগীর স্বজন, নার্স, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারলে কর্মপরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়।
সবকিছু মুখস্থ রাখার প্রয়োজন নেই। ভালো চিকিৎসাজ্ঞানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকা ও হাসপাতালের প্রটোকল ব্যবহার করতে জানা। প্রয়োজনে অনুমোদিত রিসোর্স দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখানকার স্বাভাবিক চর্চা। বাংলাদেশে থাকতে ক্লিনিক্যাল অডিট, কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, গবেষণা ও শিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। এগুলো সিভিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
সবশেষে বলব, ধৈর্যের সঙ্গে লক্ষ্য ধরে রাখুন। পথটি সহজ নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিশ্রম, ভালো যোগাযোগ দক্ষতা এবং শেখার মানসিকতা থাকলে সফল হওয়া সম্ভব। আমি নিজেও বাংলাদেশ থেকে এই পথ পেরিয়ে আজ অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছি। তাই বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।