ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন দায়িত্ব গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইলিয়াস শান্ত।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ আমার জীবনের এক গভীর আবেগময় ও গর্বের মুহূর্ত। একজন শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জায়গা নয়, এটি মানুষ গড়ার কারখানা। আমি যখন এই দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন মনে হয়েছে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় মানে অসংখ্য সম্ভাবনা, নতুন চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করা। আমার স্বপ্ন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা, যেখানে শিক্ষা হবে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং উদ্ভাবনের সমন্বয়। আমরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, যারা শুধু দক্ষ নয়, বরং দায়িত্বশীল, মানবিক এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। আমি জানি, এই পথচলায় চ্যালেঞ্জ থাকবে। কিন্তু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষকদের নিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের উদ্যম এবং সবার সহযোগিতায় আমরা প্রতিষ্ঠানটিকে অনন্য উচ্চতায় নিতে পারব।
সম্প্রতি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সাতটি ক্যাম্পাস পরিদর্শন আমার জন্য অত্যন্ত অর্থবহ অভিজ্ঞতা ছিল। অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, আগ্রহ এবং সম্ভাবনাকে কাছ থেকে আমি অনুভব করেছি। শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আমাকে আশাবাদী করেছে। শিক্ষার্থীদের কৌতূহল, শেখার আগ্রহ এবং নতুন কিছু করার উদ্যম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি মনে হয়েছে। ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও সবার মধ্যে একটি সাধারণ লক্ষ্য স্পষ্ট—ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, আবাসন এবং পরিবহনব্যবস্থায় কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেগুলো অতিক্রম করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি।
চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনা—দুটোই একসঙ্গে চলতে থাকে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভিসি হিসেবে দায়িত্বও তেমন; এখানে যেমন সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি আছে একটি নতুন মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার বড় সুযোগ। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দূরদর্শী দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এই সাত কলেজে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীরা কোনো একটি বিশেষ অবস্থায় একাডেমিক শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। এ ক্ষেত্রে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অত্যন্ত গভীর ও অর্থবহ। এই আন্দোলনের পেছনে তাদের ত্যাগ, প্রতিবাদ এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্ষতির নজিরও রয়েছে, যা সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমি এই দাবি আদায়ের আন্দোলনকে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী গণ-আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখি। তাদের এই অবদানই আজকের এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ত্যাগ, আশা ও স্বপ্নকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাঁদের এই সংগ্রামের কারণেই আজকের এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি। আমাদের প্রতিশ্রুতি হলো, তাঁদের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে একটি মানসম্মত, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা। যেখানে শিক্ষা, গবেষণা ও সুযোগ-সুবিধার ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। আমরা এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আইন অনুযায়ী নিয়মিত শিক্ষার্থীদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে পরামর্শ নেওয়া হবে এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী—উভয়েরই সম্মিলিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করি।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা খুবই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তারা চায় একটি গুণগত এবং আধুনিক উচ্চশিক্ষার পরিবেশ। এই লক্ষ্য পূরণে বর্তমান প্রশাসন ধাপে ধাপে কাজ করছে এবং করবে। আমাদের অগ্রাধিকার হলো, শিক্ষার মান উন্নয়ন, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রবর্তন, দক্ষ শিক্ষকতা নিশ্চিত করা এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমি বিশ্বাস করি, ধারাবাহিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
আন্দোলনের সময় যেসব বিভাজন, মতভেদ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো একটি স্বাভাবিক সংকটকালীন পরিস্থিতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। মতভিন্নতাকে দূরে না ঠেলে বরং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাই মূল লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করি, ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সংকট কাটিয়ে আবারও একটি ইতিবাচক এবং ঐক্যবদ্ধ একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থানের যে ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তা প্রশমনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অনেক গুরত্ব বহন করবে। কারণ, ৭ কলেজের শিক্ষকবৃন্দ প্রশাসনিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
বিষয়টি নীতিগত ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যমান কাঠামোতে ভর্তি হয়েছে, তাদের পাঠদান, পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাই প্রযোজ্য। অধ্যাদেশে কিছু ব্যাচ অন্তর্ভুক্তির কথা থাকলেও সব ব্যাচকে একসঙ্গে নতুন কাঠামোয় যুক্ত করা এটি একদিকে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও ন্যায্যতা বিবেচনায় রেখে অধ্যাদেশ অনুযায়ী ধাপে ধাপে একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে এগোনো।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এরই মধ্যে সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে প্রথম সভা সম্পন্ন হয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকসহ প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে। ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হয়নি। তবে খুব শিগগির এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আগামী দুই মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা।
একাডেমিক অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ক্যাম্পাস—দুটিই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৭ কলেজের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ধীরে ধীরে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার বিষয়েও কাজ চলছে, যাতে সমন্বিতভাবে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। আমাদের লক্ষ্য হলো, ধাপে ধাপে একটি টেকসই, আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা।
গবেষণা ও উদ্ভাবন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আমরা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ধীরে ধীরে গবেষণাভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে থাকবে গবেষণা কার্যক্রমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় গবেষণা সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পকে উৎসাহিত করা। আমাদের লক্ষ্য হলো, ক্রমান্বয়ে একটি সক্রিয় গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যাতে এই প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে ওঠে।
রাজনীতি বা সহিংসতার বিষয়গুলো অনেক জটিল ও বহুমাত্রিক। এগুলো সব সময় পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়। আমরা বিশ্বাস করি, শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের যদি একটি পরিষ্কার ভিশন ও মিশন দেওয়া যায়, তাহলে তারা নিজেদের গড়ে তোলায় এবং দেশের কল্যাণে অবদান রাখায় বেশি মনোযোগী হবে। তাই যত বেশি কো-কারিকুলার কার্যক্রম বাড়ানো যাবে, তত বেশি শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ এবং ন্যূনতম সময়ে ফলাফল প্রকাশ করে সেশনজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার একাডেমিক ও প্রশাসনিক জীবনের যাত্রা বেশ বৈচিত্র্যময় এবং একটু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে উচ্চশিক্ষা শুরু করি এবং সেখান থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি এবং ২০০১ সালে এই বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ২০০৩ সালে আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগদান করি। ২০০৬ সালে পিএইচডি গবেষণার জন্য যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই এবং সেখানে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করি। দেশে ফিরে আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হই। পরবর্তীকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করি, যেখানে সারা দেশের বিভিন্ন কলেজ পরিদর্শন ও শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র জানার সুযোগ হয়। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, চ্যালেঞ্জ ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো কাছ থেকে দেখেছি। এই দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষা, প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব চাহিদা সম্পর্কে একটি গভীর ধারণা দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতাগুলো ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উন্নয়নে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারব।
অন্তর্বর্তী প্রশাসন মূলত একটি ট্রানজিশনাল পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। একটি ক্রান্তিকালীন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান আইন ও অধ্যাদেশ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এখানে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষদেরও নির্ধারিত ভূমিকা রয়েছে, যা আইনেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে মূল লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি, পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হবে।
আমার মূল একাডেমিক বিষয় জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট। এই বিষয়ে আমি শিক্ষার্থী হিসেবে যাত্রা শুরু করি এবং পরে একই ডিসিপ্লিনে প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, পাশাপাশি পিএইচডিও সম্পন্ন করেছি। আমার এই গবেষণা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও আমার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। একপর্যায়ে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়ে মতামত চান। আমি ও আমার টিম মিলে তখন একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা তৈরি করি। যেখানে স্থানীয় মাটি, জলবায়ু ও ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বৃক্ষ নির্বাচন, উপকূল পাহাড় ও সমতলের জন্য আলাদা রোপণ কৌশলসহ বিভিন্ন তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিকল্পনার ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ধারণা গড়ে ওঠে; যা জাতীয় নীতিতেও প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের একজন সদস্য হিসেবে যুক্ত আছি। আমাদের লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখা।
আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আমি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিকে একটি আধুনিক, মানসম্মত এবং গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখতে চাই। যেখানে শিক্ষা শুধু পাঠ্যজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উদ্ভাবন, গবেষণা এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হবে। আমার প্রত্যাশা, এই বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলবে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলেই জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রয়োগে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি স্বীকৃত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যদি নিয়মিতভাবে ক্লাসমুখী হয় এবং একাডেমিক কার্যক্রমে মনোযোগী থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতির গতি আরও দ্রুত হবে।
বর্তমান কলেজশিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও সম্পৃক্ততা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কাঠামোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিনের শিক্ষাদান অভিজ্ঞতার কারণে তাঁরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা একাডেমিক কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করবে। আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী ধীরে ধীরে তাঁদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট ও কাঠামোবদ্ধভাবে নির্ধারিত হবে, যাতে একটি সমন্বিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সুতরাং, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে, পরিকল্পিত ও বিচার-বিশ্লেষণভিত্তিকভাবে এগোবে।
মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
অংশীজনের কাছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আজকের পত্রিকাকেও ধন্যবাদ।