হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা, প্রথম ধাপে ছিল কী আর কী মিলল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রথম ধাপের চুক্তি অনুযায়ী বন্দি বিনিময়ের কথা থাকলেও বাস্তবে এর আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে, এ ছাড়া আর কোনো শর্তই ঠিকঠাক মানা হয়নি। ছবি: আল জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি এখন দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করছে। এই ধাপে মূল লক্ষ্য হবে নিরস্ত্রীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গঠন এবং পুনর্গঠন। এদিকে হামাসের শীর্ষ নেতারা ও গাজার অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা আলোচনার জন্য মিসরের রাজধানী কায়রোতে অবস্থান করছেন। তবে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

প্রায় তিন মাস আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রণীত ২০ দফা পরিকল্পনা ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতির ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার অধিকাংশ শর্তই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ধাপে কী হওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবে কী হয়েছে—তার বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রথম ধাপে কী হওয়ার কথা ছিল আর কী মিলল

গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল—অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে, ইসরায়েলি বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করতে হবে, পূর্ণমাত্রায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে এবং গাজা-মিসর সীমান্তের রাফাহ ক্রসিং খুলে দিতে হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।

কারণ, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে হামলা বন্ধের কথা থাকলেও বাস্তবে হামলা বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি হামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ হাজার ২৫১ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচজন করে নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের জরুরি শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১০০-এর বেশি শিশু রয়েছে—যাদের মধ্যে অন্তত ৬০ জন ছেলে ও ৪০ জন মেয়ে।

প্রথম ধাপের চুক্তি অনুযায়ী বন্দী বিনিময়ের কথা থাকলেও বাস্তবে এর আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী হামাস ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি বন্দীকে মুক্তি দেয়। এর বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়।

এ ছাড়া নিহত ইসরায়েলি বন্দীদের ২৮টি মরদেহের মধ্যে ২৭টি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি একটি মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে সেটি চাপা পড়ে আছে।

তবে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও বন্দী বিনিময় তদারককারী সুহেইল আল-হিন্দি আল-জাজিরাকে জানান, চুক্তি অনুযায়ী যেসব নারী ও শিশু ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল, ইসরায়েল তা পুরোপুরি মানেনি।

এ ছাড়া ইসরায়েল এখনো বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে আটক রেখেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—ডা. হুসাম আবু সাফিয়া, ডা. মারওয়ান আল-হামস ও ডা. তাসনিম আল-হামস। এ ছাড়া নিহত ফিলিস্তিনি বন্দীদের মরদেহ শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জাম প্রবেশের অনুমতিও দেয়নি ইসরায়েল।

প্রথম ধাপের চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। কিন্তু তা এখনো অসম্পূর্ণ। চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাদের গাজায় নির্ধারিত একটি এলাকার (ইয়েলো লাইন) ভেতরে অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল। এই এলাকা গাজার মোট ভূখণ্ডের ৫০ শতাংশেরও বেশি জুড়ে।

কিন্তু আল-জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা সানাদ জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী মাঠে থাকা হলুদ কংক্রিটের ব্লক সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ক্রমেই বাড়াচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিনিরা ছোট ছোট গুচ্ছ এলাকায় আটকে পড়ছেন। এ ছাড়া ইয়েলো লাইনের আশপাশে ইসরায়েলি বাহিনী বৃহৎ পরিসরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী গাজায় পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, গাজায় তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণমাত্রার মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় ঢুকেছে মাত্র ২৩ হাজার ১৯টি ত্রাণবাহী ট্রাক, যেখানে ঢোকার কথা ছিল ৫৪ হাজার ট্রাক। অর্থাৎ অনুমোদিত সহায়তার মাত্র ৪৩ শতাংশ পেয়েছে গাজার মানুষ।

ইসরায়েল এখনো গাজায় মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, সবজিসহ পুষ্টিকর খাবার প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। পরিবর্তে চকলেট, চিপস, কোমল পানীয়ের মতো কম পুষ্টিকর খাবার ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ), অক্সফাম, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটিসহ তিন ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে গাজায় কাজ করতে নিষেধ করেছে ইসরায়েল।

গাজা ও মিসরের মধ্যকার প্রধান সীমান্ত রাফাহ ক্রসিং এখনো বন্ধ। প্রথম ধাপের চুক্তি অনুযায়ী এটি খুলে দেওয়ার কথা ছিল। গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ, যাতায়াত ও চিকিৎসাসেবা সরবরাহের জন্য এই রাফাহ ক্রসিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে এটি খুলে দেওয়ার শর্ত থাকলেও ইসরায়েল তা মানেনি। উল্টো বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সবশেষ ইসরায়েলি বন্দীর মরদেহ ফেরত পাওয়ার পরই কেবল রাফাহ খুলে দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে কী হওয়ার কথা আছে

দ্বিতীয় ধাপে গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসনের রূপরেখা তৈরির কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, এই ধাপে একটি অন্তর্বর্তী প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠন করা হবে। গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। অননুমোদিত সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ত্যাগে বাধ্য করা হবে এবং গাজা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

তবে গাজা সিটি থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি জানান, মাঠপর্যায়ে এখনো কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘এখনো ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভোরের দিকে বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা গেছে। অর্থাৎ গাজাজুড়ে এখনো ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।’

ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কতবার ভেঙেছে

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের পর থেকে ৯ জানুয়ারি (২০২৬) পর্যন্ত ইসরায়েল বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সরাসরি গুলির মাধ্যমে কমপক্ষে ১ হাজার ১৯৩ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির ৯৭ দিনের মধ্যে ৮২ দিনেই গাজায় হামলা হয়েছে। মাত্র ১৫ দিন ছিল এমন, যেদিন কোনো প্রাণহানি বা সহিংসতার খবর আসেনি।

এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গাজায় যুদ্ধবিরতি এখনো ‘কার্যকর’ রয়েছে। আসলেই কি তাই? আপনার কী মনে হয়?

আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

ইরানের সরকার উৎখাতে বিশ্বকে সহায়তার আহ্বান রেজা পাহলভির

ইরানে নিহত ২৪৩৫: মরদেহ জিম্মি করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ

ইরানের ওপর নতুন করে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের

গাজা শাসনে শান্তি পরিষদ গঠন করা হয়েছে—ঘোষণা ট্রাম্পের

গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণার পরও ১০ জনকে হত্যা করল ইসরায়েল

ইরানে বিক্ষোভ: উত্তেজনা কমেছে, মর্গে মানুষের ভিড়

এবার আর টার্গেট মিস হবে না! ট্রাম্পের রক্তাক্ত মুখ দেখিয়ে এ কী বার্তা দিল ইরানের টিভি

বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর নতিস্বীকার, এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করল ইরান

ইরানকে ট্রাম্পের হুমকির পর দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পথে মার্কিন রণতরি

গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ: হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র