হোম > অপরাধ

মামলার তদন্ত: ঢাকার খুনে পুলিশের ‘বিদেশ ফর্মুলা’

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 

প্রতীকী ছবি

রাজধানী ঢাকায় কোনো ‘হাইপ্রোফাইল’ (উঁচু স্তরের) কেউ খুন হলে বা অন্য কোনো আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে প্রায়ই পুলিশের ভাষ্যে উঠে আসে বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী কিংবা ‘গডফাদারের’ নাম। দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপানোর কারণে অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও তাঁদের উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত অজানা থেকে যায়।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পরিচিত কিছু অপরাধী বা পৃষ্ঠপোষকের ওপর দায় চাপালে জনমনে সহজে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়—এমন একটি হিসাব থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ এই পথ বেছে নেয়। এতে গভীর তদন্ত করে প্রকৃত পরিকল্পনাকারীর পরিচয় এবং হত্যার কারণ জেনে বিচার করার চাপ কমে। এর ফলে আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ শেষ পর্যন্ত অন্ধকারেই থেকে যায়।

খুনের দায় বিদেশে থাকা এমন সব ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের ওপর চাপানো হয়, যাঁরা সমাজে আগে থেকেই অপরাধী হিসেবে পরিচিত বা বিতর্কিত। সে ক্ষেত্রে তদন্ত এগোয় মূলত ঘটনাস্থলে উপস্থিত বা সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ধরে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন হোতারা।

গত এক বছরে রাজনীতিক, সন্ত্রাসী বা বিতর্কিত কার্যক্রমে যুক্ত ব্যবসায়ী এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত আটজনের হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ছিল বিদেশি উৎসকেন্দ্রিক। এসব ঘটনার পর জানানো হয়, খুনের নেপথ্যে রয়েছেন দেশের বাইরে অবস্থানরত একাধিক সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি। নামগুলোও ছিল পরিচিত এবং আগে থেকেই নানা অপরাধের কারণে আলোচিত। কিন্তু বিদেশে থাকা কথিত অপরাধীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার নিশ্চিত প্রমাণ আর তদন্তে সামনে আসেনি। গ্রেপ্তারও হয় কেবল ঘটনাস্থলে থাকা শুটার, অস্ত্রের জোগানদাতা বা সহায়ক ‘লাইনম্যানরা’। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের কোনো কোনো মামলা এভাবে একসময় চলে যায় হিমাগারে।

ঢাকায় গত ছয় মাসের একাধিক হত্যা মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তদন্তে দায়ী করা হয়েছে বিদেশে থাকা ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের ওপর।

অতি সম্প্রতি এ ধরনের দাবি করা হয়েছে কারওয়ান বাজারে ৭ জানুয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বিরের হত্যাকাণ্ডের পর। ডিবি পুলিশ দাবি করেছে, এই হত্যার পরিকল্পনা হয় দেশের বাইরে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মুছাব্বিরকে হত্যা করতে সাড়ে চার মাস আগে পরিকল্পনার পর বিদেশ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়। কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বই এ হত্যার পেছনের কারণ। হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে একটি দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়। তদন্তে যুক্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ বলেছে, মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও পলাতক আসামি মফিজুর রহমান ওরফে মামুন বিদেশে বসে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও দেনা-পাওনার বিরোধ থেকে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে কিবরিয়াকে হত্যা করান।

পুলিশ জানিয়েছে, ২০২১ সালে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে বের হয়ে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মামুন মালয়েশিয়ায় আর তাঁর ভাই মশি ভারতে পালিয়ে আছেন।

কিবরিয়া হত্যার কয়েক দিন আগে ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন (৫৬)। ঘটনার পর পুলিশ বলেছিল, মামুন দীর্ঘদিন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক বছর ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। দেশের বাইরে থাকা ইমনের নির্দেশেই মামুনকে হত্যা করা হয়।

গত বছরের ২৫ মে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় কারণ হিসেবে সামনে আসে চাঁদাবাজি নিয়ে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্ব। স্বীকারোক্তির সূত্র দিয়ে ডিবি পুলিশ বলেছে, সাধন হত্যার নেপথ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী হাসান ওরফে কলিন্স।

এর কিছুদিন আগে ২১ মার্চ গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন (৩৩) নামে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে। কেব্‌ল ও নেট ব্যবসার দখল নিয়ে বিদেশে থাকা বাড্ডা ও গুলশানের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও রবিন এই হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

হত্যার পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতা দেশের বাইরে আছেন–পুলিশের প্রায়ই এমন দাবির ‘প্রবণতার’ সমালোচনা করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘কোনো কোনো বড় অপরাধী দেশ-বিদেশে থাকে। তবে সব ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে। এসব পরিচিত নাম সামনে আনলে সাধারণ মানুষ সহজেই তা বিশ্বাস করে নেয়—এমন একটি ধারণা থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ এই কৌশল অনুসরণ করে। ফলে প্রকৃত নেপথ্য শক্তি, স্বার্থচক্র ও হত্যার উদ্দেশ্য অন্ধকারেই থেকে যায়। তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকে কেবল অস্ত্রের ট্রিগার টানাদের শনাক্তকরণের মধ্যেই।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘হত্যাসহ যেকোনো ফৌজদারি মামলায় ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা অন্যতম আসামি। কিন্তু তাঁদের গ্রেপ্তার বা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় না আসলে মামলার তদন্ত এগোয় না। ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা পরিবারও ন্যায়বিচার পায় না।’

তবে পুলিশ বলছে, তাদের এমন দাবির ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলক কিছু নেই। হত্যার সঙ্গে যাদের যেটুকু জড়িত থাকা বা দায় তদন্তে পাওয়া যায়, তা-ই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আগেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পলাতক সদস্যদের সম্পৃক্ততা ছিল, এখনো আছে। অপরাধীরা এখন বিভিন্ন দেশে রয়েছে, তারা বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে এই সব হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

ভিক্ষুকের বিকাশ-নগদে চাঁদাবাজির ২১ লাখ টাকা

মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজ ধরে ঘোরাল পুলিশ

ওসির অ্যাকাউন্টে বিপুল লেনদেনের অভিযোগ

যাত্রাবাড়ীতে ছুরিকাঘাতে মাদ্রাসাছাত্র খুন, কিশোর হেফাজতে

কাশিমপুর কারাগারে ‘আয়নাবাজি’ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন আজিজুল

তিনটি খুন, পেছনে মাদকাসক্ত ছেলেরা

অর্থ পাচারের অভিযোগে গানবাংলার তাপসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী নারীকে বিয়ের ফাঁদে ফেলে কোটি টাকা আত্মসাৎ, ‘স্বামী’ গ্রেপ্তার

৩৬৩টি আইফোনসহ তিন চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার

পুলিশের নজরদারিতে ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা