দেশের চলমান জ্বালানিসংকটের এই সময়ে কৌশলগত সুলভ মূল্যের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিদ্যমান শুল্ক বাধা তুলে ধরলেন ব্যবসায়ীরা। আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এই খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর জ্বালানিসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মূল কারণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হলেও এ খাতটি প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর আরোপ রয়েছে, যা বিনিয়োগে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। অথচ প্রচলিত জ্বালানি খাত বিভিন্ন পর্যায়ে ভর্তুকি ও নীতিগত সুবিধা পাচ্ছে, যা একটি নীতিগত বৈষম্য তৈরি করেছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাকিস্তান, ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলো কর অব্যাহতি, কম শুল্ক এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আমদানিতেও উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান, যা খাতটির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫-১২০ ডলারে পৌঁছেছে এবং হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন হচ্ছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল। তবে সরবরাহ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএসআরইএ জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডির বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ৮৫০-৯০০ এমএমসিএফডিতে। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া দেশে কৌশলগত জ্বালানি মজুত মাত্র ৩৫-৪০ দিনের জন্য যথেষ্ট, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম।
এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে। গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে, যা রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক নয়; বরং এটি দেশের জ্বালানি কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার প্রতিফলন। তাই টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর অপরিহার্য।
এ সময় সংগঠনটি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর শুল্ক ও কর কমিয়ে আনা, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে শূন্য শুল্ক নির্ধারণ, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং স্থগিত থাকা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
এ ছাড়া রুফটপ সোলার কর্মসূচি পুনরায় চালু, নেট মিটারিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সৌরচালিত সেচপাম্প সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর অবকাশ প্রদানের সুপারিশও করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, সিনিয়র সহসভাপতি জাহিদুল আলম, সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার রোজেল ও পরিচালক (অর্থ) নিতাই পদ সাহাসহ অন্যরা।