নেপাল ও বাংলাদেশ ঢাকায় বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের বৈঠক পুনরায় শুরু করতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিষয়গুলো, বিশেষ করে প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং এর আওতাভুক্ত পণ্যের তালিকার বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসবে।
নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, দুই দিনের এই বৈঠক আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হওয়ার কথা। বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন নেপালের বাণিজ্যসচিব রাম প্রসাদ ঘিমিরে এবং বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার লক্ষ্য হলো—অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং উপ-আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করা।
এর আগে নেপাল–বাংলাদেশ বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের ষষ্ঠ বৈঠকটি ২০২০ সালের অক্টোবরে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় দুই দেশ ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো একটি দ্বিপক্ষীয় পিটিএ স্বাক্ষরের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়। তবে শুল্ক ও প্যারা-শুল্ক সংক্রান্ত মতবিরোধের কারণে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
নেপালের শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাঠমান্ডু পোস্টকে জানান, পিটিএ স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে বাংলাদেশ কর্তৃক নেপালি পণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক ও প্যারা-শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি এবারও জোরালোভাবে তুলবে কাঠমান্ডু।
২০২০ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পিটিএর উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে নেপাল জোর দিয়ে বলেছিল, বাংলাদেশের সব আমদানির ওপর আরোপিত তথাকথিত ‘অন্যান্য শুল্ক’ বাতিল করতে হবে। নেপালের যুক্তি ছিল, এসব গোপন চার্জ নেপালি রপ্তানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
সাধারণত প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট সদস্য দেশগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দেওয়ার সুযোগ দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ এই ধরনের অন্যান্য শুল্ক আরোপের অধিকার রাখে। নেপালি কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত শুল্কের সঙ্গে এসব চার্জ যোগ হলে নেপালি রপ্তানি পণ্যের ওপর মোট শুল্ক ভার ১৩০–১৩২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কায় বাংলাদেশ এসব শুল্ক প্রত্যাহারে অনাগ্রহী হয়ে থেকেছে।
পিটিএ চূড়ান্ত করার আগে নেপালকে সম্ভাব্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের একটি তালিকাও প্রস্তুত করতে হবে। কর্মকর্তারা জানান, গত এক বছরে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের কারণে এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ বলে যে, তারা শুল্ক, প্যারা-শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ প্রত্যাহার করবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আগের দফাগুলোর তুলনায় আমরা সম্ভাব্য পণ্যের তালিকা হালনাগাদ করেছি, এবং বৈঠকের সময় এটি চূড়ান্ত করা হবে।’
কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা এবং সম্ভাব্য রপ্তানি ও আমদানি পণ্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো পিটিএ চূড়ান্ত করা যায় না। পাল্টা শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ আরোপ অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের বাজারে নেপালি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে গেছে।
পিটিএর বাইরে, বৈঠকে সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হবে। নেপাল ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কাছে একটি দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির খসড়া পাঠিয়েছে, যা আলোচনায় তোলা হবে। ট্রানজিট ও সংযোগ বিষয়ক ইস্যু—বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ ইতিমধ্যে রহনপুর–সিংহাবাদকে পোর্ট অব কল হিসেবে দিয়েছে এবং নেপাল এই বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে পারে।’ রহনপুর–সিংহাবাদ রেলপথকে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অতিরিক্ত বাণিজ্য করিডর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই রুট ভারত হয়ে বাল্ক ও কনটেইনার কার্গো পরিবহনের সুযোগ তৈরি করবে। এটি বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ কমতে পারে, যদিও প্রক্রিয়াগত জটিলতা এখনো রয়ে গেছে।
কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে অন্যান্য সম্ভাব্য রেল সংযোগ বিকল্প নিয়েও আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ব্যবস্থাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। খাদ্য, উদ্ভিদ ও প্রাণিজ পণ্যের মান একীভূত করা, কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা জোরদার করা এবং জৈব পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিলের মাধ্যমে অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নেপালি শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা সংক্রান্ত বিষয়টিও আলোচনায় উঠবে। বর্তমানে বাংলাদেশ এসব শ্রেণির নেপালি নাগরিকদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রদান করে না।
বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন রুপি। কাস্টমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (মধ্য জুলাইয়ে শেষ হওয়া) নেপালের বাংলাদেশে রপ্তানি আগের অর্থবছর ২০২৩–২৪ এর তুলনায় ২০ শতাংশ বেড়ে ৬৬৬ দশমিক ১৫ মিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে নেপালের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে—আখ থেকে নিষ্কাশিত বা পরিশোধিত মোলাসেস, লাল ডাল, হাতে চালিত মেঝের ঝাড়ু, ঔষধি ও সুগন্ধি উদ্ভিদ, কাঁচা খয়ের, ভুসি, শার্পস ও অন্যান্য শস্য অবশিষ্টাংশ, এবং ফল ও সবজির বীজ।
একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে নেপালের আমদানি ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। নেপাল প্রধানত বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট, ওষুধ, আলু, টয়লেট পেপার, লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি, রস্ক, জুস, হেয়ার অয়েল, সুতা, বস্ত্র ও ফাইবার, এবং চকলেট আমদানি করে।
দক্ষিণ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট—এসএডব্লিউটিইই) এর ২০২৩ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের রপ্তানি এখনো অত্যন্ত সীমিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশে নেপালের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে নেপালের বাংলাদেশে রপ্তানি দ্রুত বেড়েছিল—২০০৮ সালে যা সর্বোচ্চ ৬৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকে রপ্তানি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ২০০৭–২০১০ সময়কালে নেপালের রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অংশ বেড়েছিল, কিন্তু গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময়েই বৈশ্বিক মোট রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশে নেপালের রপ্তানি নগণ্যই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে নেপালের আমদানি ২০০৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০০৬ সালে যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারে, এবং ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ১২৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, বাংলাদেশ থেকে আমদানি নেপালের মোট বৈশ্বিক আমদানির এক শতাংশেরও কম, যা সামগ্রিক বাণিজ্য সংযোগের সীমাবদ্ধতাকেই নির্দেশ করে।
এসএডব্লিউটিইই-এর গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের রপ্তানিতে পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। রপ্তানি অত্যন্ত বেশি নির্ভরশীল একটি মাত্র পণ্যের ওপর—ডাল—যা গড়ে বাংলাদেশের বাজারে নেপালের মোট রপ্তানির ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। নেপালের শীর্ষ দশটি রপ্তানি পণ্য মিলিয়ে বাংলাদেশের বাজারে মোট রপ্তানির ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ দখল করে আছে।
এই সংকীর্ণ রপ্তানি কাঠামোর প্রতিফলন হিসেবে, বাংলাদেশের প্রতি নেপালের রপ্তানিতে কৃষিপণ্যই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ২০১৭–২০২১ সময়কালে বাংলাদেশের প্রতি নেপালের গড় রপ্তানির প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল কৃষিপণ্য, যার মধ্যে শুধু ফল, সবজি ও উদ্ভিদ শ্রেণিই প্রায় ৯১ শতাংশ জুড়ে ছিল।