রাজশাহীর গ্রামে গ্রামে ঘুরে আম কিনে বিক্রি করতেন মুন্তাজ আলী। সেই ঐতিহ্যগত ব্যবসাকেই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে ছেলে মুরাদ পারভেজ তৈরি করেছেন একটি সফল ই-কমার্স উদ্যোগ। ঝুড়িতে আম নিয়ে হাটে না গিয়ে তিনি ফেসবুক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্ডার নিয়ে সারা দেশে খাঁটি আম, খেজুরের গুড় ও লিচু পৌঁছে দিচ্ছেন।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞানে স্নাতক এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টিতে স্নাতকোত্তর করা মুরাদ ২০২০ সালে ‘ম্যাংগো লাভার’ নামে তাঁর ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। লক্ষ্য একটাই—ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
শুরুর দিকে এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই তাচ্ছিল্য করেছিলেন। ‘বাপে আম বেচত, ব্যাটাও তাই করছে’—এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে। কিন্তু বাজার ও ভোক্তার চাহিদা বুঝেছিলেন মুরাদ। প্রথম বছরেই আম বিক্রিতে ভালো সাড়া পেয়ে তিনি শীত মৌসুমে যুক্ত করেন রাজশাহীর খাঁটি খেজুরের গুড়।
বর্তমানে তাঁর প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩০০ ক্রেতার কাছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কেজি গুড় পাঠানো হচ্ছে। এই বিশাল সরবরাহের পেছনে রয়েছে পবা উপজেলার বজরাপুর ও কাঠালবাড়ি এবং দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছি গ্রামের ১০৬ জন গাছি। মুরাদের নির্দেশনায় তাঁরা কেবল রস জ্বালিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গুড় তৈরি করেন—কোনো রাসায়নিক বা চিনি ব্যবহার করা হয় না।
পড়াশোনা করেছি পুষ্টিবিজ্ঞানে। আমার নীতিই হলো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াব। মুরাদ পারভেজ উদ্যোক্তা, ম্যাংগো লাভার
এই উদ্যোগ শুধু ভোক্তাদের নয়, বদলে দিয়েছে গ্রামের অর্থনীতিও। মুরাদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৩৫ জনের স্থায়ী চাকরি হয়েছে। আর প্রায় ৬ হাজার খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির মাধ্যমে আরও ৮০ জনের বেশি গাছি নিয়মিত আয় করছেন। আগে যে খেজুরগাছ কেটে ফেলা হতো, এখন তা হয়ে উঠেছে আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ম্যাংগো লাভার বর্তমানে নালি গুড় বিক্রি করছে কেজিপ্রতি ৩৯০ টাকা, আর বীজ (চকলেট) ও পাটালি গুড় ৪৯০ টাকা দরে। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও খাঁটি পণ্যের নিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা নির্ভর করছেন এই ব্র্যান্ডের ওপর।
উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ বলেন, ‘আমার গ্রামে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে, পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। শুরুতে যখন আম, লিচুর অর্ডার নিলাম, তখন সবাই বলত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এসে আমের ব্যবসা শুরু করলে? লেখাপড়া করে কী লাভ হলো? কিন্তু আমি পড়াশোনা করেছি পুষ্টিবিজ্ঞানে। আমার নীতিই হলো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াব। এটাই করে আসছি। তাই সাড়া পেয়েছি।’
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ই-কমার্সে ভেজাল গুড় নিয়ে অনেক অভিযোগ পাই। তবে মুরাদের সরবরাহকারীদের আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। তাঁরা খাঁটি গুড়ই তৈরি করেন। সততা ও স্বচ্ছতার কারণেই মুরাদ দ্রুত সফল হয়েছেন।’