টানা চার মাস ধরে বাড়তে বাড়তে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ঘরে উঠেছে। এই মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে। যা জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির এই মূল্যস্ফীতি গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মাসের মূল্যস্ফীতি সামান্য কম ছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
আজ রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মুদ্রা বিনিময় হারের প্রভাব- সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমে গেলেও তার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে যাওয়াকে বোঝায়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত- দুই খাতেই মূল্যস্ফীতি হয়েছে। একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিবিএস বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এটি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ নিয়ে টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ঘটছে। তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ।
খাদ্যবহির্ভূত খাতে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, যা গত জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই খাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারির ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। তার আগের মাস, এপ্রিল মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।
বিবিএসের হিসাব বলছে, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। বিবিএসের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রায় তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আবার উসকে দিচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধি যদি মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তাহলে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ভোগ ক্ষমতা কমে যায়। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতির সমন্বয় না হলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো কঠিন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
মূল্যস্ফীতি কী
মূল্যস্ফীতি মূলত পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধিকে বোঝায়। এটি অনেকটা পরোক্ষ করের মতো প্রভাব ফেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোনো পণ্য ও সেবা কিনতে যদি ১০০ টাকা খরচ হতো, তাহলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই জিনিস কিনতে গড়ে ১০৯ টাকা ১৩ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ১৩ পয়সা।