হোম > অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সারসংকটে পড়তে যাচ্ছে কি

বিবিসি বাংলা

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশের কৃষি খাতকে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ নিয়ে সমগ্র বিশ্বের মতো উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের কৃষকেরাও। দেশে সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে। এ ছাড়া দেশীয় সার কারখানাগুলোর বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এরই মধ্যে চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পেয়ে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে অনেক কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েছেন; আসন্ন আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়েও চিন্তায় আছেন তাঁরা।

যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

আমিন উর রশিদ বলেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিসরের মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে সরকার যোগাযোগ করছে।

সার মজুত এবং সরবরাহের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে দেখা গেছে ভিন্ন পরিস্থিতি। দেশের কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি কিংবা সারের সংকট তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা।’

বাধাগ্রস্ত সার উৎপাদন

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। প্রতিদিন ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে। সরকারের পক্ষ থেকেও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা; যা সার উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, দেশের সার কারখানাগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গ্যাস সাশ্রয় করতে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রেখেছে সরকার। উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বেসরকারি কাফকো সার কারখানায়ও; যা দেশের কৃষি খাতের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, কারখানাগুলো শিগগির উৎপাদনে ফিরবে। সারের মজুত পর্যাপ্ত থাকায় জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে সার কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি বলেছেন এরই মধ্যে চালু করে দেবেন। অন্তত ঘোড়াশালও যদি চালু করে দেয়, তাহলেও আমরা প্রতিদিন ২৮ শ টনের ওপর পেয়ে যাব।’

তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কেবল মজুত দিয়ে দীর্ঘ সময় সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা চীন, মিসর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে দ্রুত সার আমদানি নিশ্চিত করা এবং বন্ধ থাকা দেশীয় কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশের ফসলি মৌসুম অনুযায়ী এখন সারের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় আপাতত তেমন সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, ‘এই মৌসুমে ধান এখন শেষের দিকে আছে, সেখানে খুব একটা সারের প্রয়োজন নেই। কিছু জায়গায় লেইট প্লানটেশন হয়েছে সেখানে কিছু সার হয়তো লাগবে।’

কিন্তু বিকল্প উৎস থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা ঠিক হবে না বলেই মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমরা যেহেতু বিকল্প উৎসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি, সেক্ষেত্রে দামও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। তবে কৃষি তো এককভাবে চলে না, একটা সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।’

মজুত কতটুকু?

কৃষিনির্ভর দেশ হলেও বাংলাদেশের সারের চাহিদার প্রায় সবটাই বিদেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করতে হয়। সরকারি পাঁচটি ও বেসরকারি একটি কারখানায় কিছু সার উৎপাদিত হলেও বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টনই লাগে ইউরিয়া সার। যার কেবল ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হয়। অর্থাৎ কৃষিতে প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের আমদানি এবং চাহিদা পূরণ নিয়ে বাংলাদেশকে শঙ্কায় ফেলেছে।

যদিও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলছেন, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকায় এই মুহূর্তে সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। তিনি দাবি করেন, ‘আমদানি করা সারের এখনো যতটা মজুত আমাদের কাছে আছে, তাতে আরও মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে।’

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং এমওপি মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার টন।

মন্ত্রী বলছেন, এখন বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে। ফলে আগামী কয়েক মাস নতুন করে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন পড়বে না।

এ ছাড়া বর্ষা শেষে আমন মৌসুমেও ইউরিয়ার চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। মূলত আগামী বছরের বোরো মৌসুমকে লক্ষ্য করেই এখন থেকে আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘কাতার, সৌদি আরব থেকে আমরা মূলত ইউরিয়া আমদানি করতাম। এই মুহূর্তে কোনো ক্রাইসিস নাই, তবে এটা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া তাই আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি।’

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা

বৈশ্বিক জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সারের তিন ভাগের এক ভাগ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়েই সরবরাহ করা হয়। আর এই পথটি গত প্রায় এক মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। যার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। টনপ্রতি যে সারের দাম ছিল ৪৯০ ডলার, তা এখন ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

এরই মধ্যে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে সংকটে পড়েছে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফারমার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কৃষি ব্যবসাগুলোকে ‘প্রচণ্ড চাপের’ মধ্যে ফেলছে। জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ খামারিরা।

এদিকে কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু সারের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় বড় আঘাত হানতে পারে। তাঁদের অনুমান অনুযায়ী, এর ফলে বিশ্বব্যাপী গমের দাম চার দশমিক দুই শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তবে বৈশ্বিক এই সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাশিয়া এখন বিশ্ববাজারে সারের বড় যোগানদাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যাংক এশিয়ার কাছে ৪৭.৫ মিলিয়ন ডলারে বাংলাদেশি কার্যক্রম বিক্রি করছে পাকিস্তানি ব্যাংক আলফালাহ

দেশের বাজারে বাড়ল সোনা-রুপার দাম

জ্বালানি তেল অবৈধ মজুতের তথ্য দিলে পুরস্কার দেবে সরকার

আবারও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এল ৬২ হাজার ১৫০ টন গম

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সর্বাধিক মূল্যস্ফীতি হবে দ. এশিয়ায়, কমবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও: এডিবি

এবার সোনার ভরিতে কমল ৬৫৯০ টাকা

চট্টগ্রাম বন্দর ও সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড: রেলের ইঞ্জিন সংকটে আবার বাড়ছে কনটেইনার জট

আট মাসের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি: দিন দিন বাড়ছে ঘাটতির বোঝা