চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা মাশুল ৪০ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না। এমন মন্তব্য করে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ ও গতিশীল করতে নীতিগত বাধা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতি আগামী তিন মাসের মধ্যে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটে আয়কর ও ভ্যাটে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় ধরনের ছাড়ের সুযোগ রাখা হতে পারে।
বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত বাজেট-পূর্ব পরামর্শক কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। সভাটির আয়োজন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। জাতীয় বাজেটের আগে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শুনে খারাপ লাগতে পারে, আগামী বাজেটে ইচ্ছা থাকলেও হয়তো অনেক সুবিধা দিতে পারব না। তবে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব বাধা আছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতই অর্থনীতির চালিকা শক্তি, যারা প্রবৃদ্ধি জোগাবে। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর এ খাতের সমস্যা সমাধানে ব্যবসায় বিদ্যমান বাধা দূর, সেবা প্রদানে দুর্নীতি বন্ধ ও বন্দর ব্যবস্থাকে সচল রাখায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট বাধার তালিকা দিলে আগামী তিন মাসের মধ্যে তা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট বড় করা না হলে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে না। উন্নয়ন বাজেটও বাড়াতে হবে, নইলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে না।’ মেগা প্রকল্পে অপচয়ের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, কার্যকর অবকাঠামো বিনিয়োগে জোর দেওয়া হবে। ‘মেগা প্রকল্প করে অর্থ পাচার হলে তো সমস্যা,’ বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে দুই বছরের ‘কুশন’ বা সময় চাওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘তৃতীয় বছর থেকে অর্থনীতি গতি পাবে।’ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন সরকারকে বাড়তি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলেও জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত ভালো করছে, তবে অন্যান্য খাত কেন পিছিয়ে রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতেও তৈরি পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, অনেক শিল্প খাত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি আছে উচ্চ সুদহার ও নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা। এখন নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকার সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের অর্থনীতি চাঙা করার চেষ্টা করছে। সুদের হারে দুই অঙ্ক থেকে কমিয়ে এনে তা বিনিয়োগবান্ধব করা হবে বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে খাতভিত্তিক স্বস্তি ও জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধি—দুই বিষয়কে সমন্বয় করেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে প্রস্তাব রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ট্যাক্স ও ডিউটির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রেগুলেশন কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার আশ্বাসও দেন তিনি। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে বলেও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
সভায় এফবিসিসিআই ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। নারী ও প্রবীণদের জন্য তা সাড়ে ৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ করারও সুপারিশ করা হয়। এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে সংগঠনের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বাজেট ব্যবসাবান্ধব ও সহায়তামূলক করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে করহার কমানো, করব্যবস্থা সহজীকরণ, ১০০ টাকার ন্যূনতম কর চালু, মোবাইল অ্যাপে রিটার্ন জমার সুযোগ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনার প্রস্তাব করেন।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান ভ্যাট কমিয়ে আয়কর বাড়ানো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ করব্যবস্থা এবং করপোরেট আগ্রাসন ঠেকাতে নীতিগত সুরক্ষা দাবি করেন।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) পক্ষ থেকে গাড়িতে আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি জানানো হয়।