স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কের উচ্চ হার রাখা যাবে না। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে ক্রমান্বয়ে শুল্কহার কমানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনবিআর ভবনে আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস-২০২৬ পালন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
দিবসটি উপলক্ষে সোমবার এনবিআরে সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস ও কাস্টম স্টেশনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে গত দেড় বছরে শুল্ক বাড়ানো হয়নি; বরং জনস্বার্থ বিবেচনায় বেশ কিছু নিত্যপণ্যের শুল্কহার কমানো হয়েছে।
মো. আবদুর রহমান খান আরও বলেন, শুধু দেশীয় কিছু শিল্পের সুরক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই এখন শুল্ক রাজস্ব আয়ের বড় উৎস নয়; বরং অবৈধ পণ্যের আমদানি বন্ধ করা ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার ঠেকানো শুল্ক বিভাগের প্রধান কাজ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে শুল্কের অবদান ছিল ২৭ শতাংশ।
এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশি সিগারেট ঠেকাতে বিমানবন্দরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং কঠোরভাবে দমন করা হবে।
পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ৯০ শতাংশ মালামাল এক দিনে খালাস হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে পণ্য পরীক্ষার বিষয় থাকলে বা গোয়েন্দা তথ্য থাকলে, পণ্য আটকে রাখা হয়। কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাপড়ের কথা বলে মাদক নিয়ে আসা হয়।
এদিকে পণ্য খালাস আরও সহজ করতে সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন (ডব্লিউসিও) ২৬ জানুয়ারিকে কাস্টমস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশও সংস্থাটির সদস্য হিসেবে দিবসটি পালন করে থাকে।
অনুষ্ঠানে এনবিআরের বিভিন্ন বিভাগের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এনবিআর জানায়, ফ্রন্টলাইন বর্ডার এজেন্সি হিসেবে বাংলাদেশ কাস্টমস সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্য কার্যক্রম সহজ করার পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র, অবৈধ স্বর্ণ, খাদ্য ও ওষুধ চোরাচালান এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করছে। এর মাধ্যমে দেশের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ কাজে পুলিশ, বিজিবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।
এনবিআর এও জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ), ডব্লিউসিওর রিভাইজড কিয়োটো কনভেনশন (আরকেসি) ও সিএমএএ চুক্তির আওতায় এবং সার্ক, ডি-৮, তুরস্ক, সৌদি আরব, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কাস্টমস প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা হয়েছে। চোরাচালান শনাক্ত ও প্রতিরোধে ডব্লিউসিওর রিআইএলও এবং কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (সিইএন) ব্যবহৃত হচ্ছে।
এনবিআর বলছে, বাংলাদেশ কাস্টমস দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ২৭ শতাংশ এসেছে কাস্টমস খাত থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণ, দেশীয় শিল্পের জন্য রেয়াতি সুবিধা ও ট্যারিফ সুরক্ষা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার মাধ্যমে রপ্তানি উৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে শুল্ক কাঠামো সংস্কার ও মেধাস্বত্ব বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজীকরণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তথ্যমতে, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের অংশ হিসেবে কাস্টমস প্রশাসন আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে এনবিআর। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, আইবাস++ এর সঙ্গে সংযুক্তি, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালুর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত ও কাগজবিহীন হয়েছে। টাইম রিলিজ স্টাডি অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য এক দিনের মধ্যেই শুল্কায়ন সম্পন্ন হচ্ছে। নন-ইনট্রুসিভ ইন্সপেকশন, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও), কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ই-অকশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বাণিজ্য নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা, চোরাচালান ও আন্তসীমান্ত অপরাধীদের নতুন কৌশল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা—এসব কারণে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উচ্চ পেশাদারত্ব, বিশেষায়িত দক্ষতা, দেশি-বিদেশি অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় এবং সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ করছে বাংলাদেশ কাস্টমস।