দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে সরকারি সংস্থাগুলোর সেবা প্রদানে ধীরগতি, এমনই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই সরাসরি এই অভিযোগ জানিয়েছেন, আর সেই অভিজ্ঞতাই এখন বিদেশিদের কাছে দেশে বিনিয়োগ পরিবেশের চিত্র সম্পর্কে সবচেয়ে নেতিবাচক বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘দ্য কম্পাস ডায়ালগ’ শীর্ষক সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ট্যাকটিকস রিসার্চ (আইএসটিআর) আয়োজিত এই সংলাপে অংশ নেন বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়ীরা—যেখানে সরাসরি উঠে আসে বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার ফারাক।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সরকারি সংস্থাগুলোর কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। তাঁরা যেভাবে দ্রুত কোনো সমস্যা সমাধান বা সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করেন, বাস্তবে তা পান না। এই ব্যবধানই বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ইস্যুতে একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের হতাশ করে তুলছে। তাঁর মতে, এই ধীরগতিই এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
মির্জা ফখরুল স্বীকার করেন, দেশের বর্তমান ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন। তবে সরকার এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোকে গতিশীল করা, প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা এবং একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি নিয়মিত পর্যালোচনা করছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
একই সঙ্গে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ফসলভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জ্বালানি খাতেও নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেন মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে, বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থলভাগ ও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ খাতে দরপত্র আহ্বানের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি, যা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব। তাঁর মতে, অতীতের সব সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।
বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্য এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতার বিষয়টিও বিনিয়োগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট এখনো দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এই সমস্যারও সমাধান খুঁজতে কাজ করছে।
এই সংলাপের লক্ষ্য হলো জাতীয় অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা, যাতে তাৎক্ষণিক নীতিগত প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনা যায়।
বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উদ্যোগ নীতিনির্ধারণে সমন্বয় ও স্পষ্টতা বাড়ানোর জন্য একটি কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।