হোম > অর্থনীতি

২৭ লাখ মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে, কী বৈষম্যবিরোধী শেখাচ্ছেন আমাকে অন্তর্বর্তী সরকার! দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ক্ষোভ

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে অন্তর্বর্তী সময়কালে আরও ২৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, যার বড় অংশ নারী। জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, করব্যবস্থা সংস্কার, পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারসহ নানা ক্ষেত্রে যথাযথ আলাপ-আলোচনার ঘাটতি এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার (২৭ মে) রাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে ‘কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক গণমাধ্যমের এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক রূপরেখার অভাব, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নক্ষমতা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তোলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, সংবিধান, নির্বাচন, বিচার নিয়ে যেমন পথরেখার দাবি তোলা হয়, তেমনি অর্থনীতির জন্য কোথায় সেই কাঠামোগত দিকনির্দেশনা?

তাঁর বক্তব্য নতুন সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যেন তারা কেবল পরিবর্তনের নামে একই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে না রাখে, বরং সত্যিকারের নীতি সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আপনি চিন্তা করে দেখেন, এই সরকারের সময়কালে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসাবে ২৭ লাখ মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হয়ে গেছে। আর ওই দরিদ্র মানুষের ভেতরে ১৮ লাখ হলো নারী। আপনি আমাকে কী বৈষম্যবিরোধী শিখাচ্ছেন, নতুন সরকার! এই সরকারকে এই বাজেটে বলতে হবে গত সময়ের থেকে ভিন্ন কী তারা করল? ওই দুই টাকা বাড়িয়েছে এখানে, চার টাকা কমিয়েছে এখানে—এই আলোচনায় মন ভরবে না। আমি আগে তো বলেছি যে, তিনটি বড় বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকার এসেছিল— ভিত্তিভূমিকে নির্দিষ্ট করা; স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে কিছু নিয়ে আসা এবং সংস্কারের পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা।

বর্তমান সরকারের সময়ে এতগুলো সংস্কারের কর্মসূচি হয়েছে, এত সংস্কারের পথরেখা চায়, নির্বাচনের পথরেখা চায়, বিচারের পথরেখা চায়। আমি জিজ্ঞেস করি, আমার অর্থনীতির পথরেখা কোথায়? সরকার বদল হলেও প্রক্রিয়া বদল হলো না। কিন্তু অর্থনীতির পরিকল্পনা কোথায়?’ আমি আগে তো বলেছি, তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই সরকার এসেছিল। তা হলো—ভিত্তিভূমিকে নির্দিষ্ট করা, স্থিতিশীলতাকে ফিরে নিয়ে আসা এবং সংস্কারের যে প্রতিবন্ধকতা আছে, তা সংস্কারের মাধ্যমে চিহ্নিত করা। কিন্তু এখানে যা ঘটেছে, তা প্রত্যাশার অংশ ছিল না।’

অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ আলাপ-আলোচনা না করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও পুঁজিবাজার সংস্কারের সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আলাপ-আলোচনা কতটুকু সীমিতভাবে হয়েছে, আমি তার দুটি উদাহরণ আপনাদের বলি। এখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মহোদয় এখানে বসা আছেন এবং কমিটির প্রধান আছেন, উনারা কাজ করেছেন। আমার শ্বেতপত্রেও বলা আছে, এটাকে (এনবিআর) দুই ভাগ করা হোক। যারা কর আহরণ করে এবং যারা করনীতি করে দুজনকে একসঙ্গে থাকা উচিত না—এখানে স্বার্থের সংঘাত হবে। একটা ঠিক কাজ আলাপ-আলোচনা ব্যতিরেকে যে কমিটি রিকমান্ড করেছিল, তা পরিপালন না করে যদি আপনি বাস্তবায়ন করতে চান, আপনার যে দুঃখজনক পরিণতি হয়েছে, তা-ই হওয়ার কথা। ঠিক কাজও যদি সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে করেন, তাহলে এমন পরিণতি হবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমি আরেকটি উদাহরণ দিই, এই যে স্টক মার্কেটের জীর্ণদশা। এটা আসলেই মৃতপ্রায়। ওটা আইসিইউর ভেতরে। ছিল ২৭ শতাংশ, কিন্তু এখনো জিডিপির ভ্যালু হিসেবে আছে ৯ শতাংশ। এটাকে চালু করার জন্য যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তাহলে স্টক মার্কেটে যাঁরা অংশীদার রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে যদি আলোচনা না করে সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন একা করতে যায়, তাহলে কোনো দিনই সম্ভব না। মানুষের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে ঠিক কাজও বেঠিক হয়ে যায় যদি আলাপ-আলোচনা উন্মুক্ত না থাকে। এটা আমার প্রথম বক্তব্য আপনার কাছে। আলাপ-আলোচনা করতে হবে এবং সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। কী পরিবর্তন করলাম একটা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর থেকে।

সিপিডির এ সম্মাননীয় ফেলো বলেন, ‘আমার দ্বিতীয় বক্তব্য আপনাদের কাছে, ড. আনিসুজ্জামান (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) আছেন এখানে, সেটা হলো অন্তর্বর্তী বাজেটের বিষয়ে বলেছেন। অন্তর্বর্তী বাজেট কী? যে বাজেট নিয়ে কাজ করছেন, সেটা পতিত সরকারের বাজেট। পতিত সরকারের বাজেট নিয়ে আপনি প্রথমে প্রাক্কলন করেছেন জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের দিকে এসে। কিন্তু কাঠামোগত কী উন্নয়ন করলেন? ওই প্রাক্কলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ধারণা ছাড় দেবেন না বলতেছেন। এখানে কাকে ছাড় দিচ্ছেন, কাকে ভর্তুকিতে রাখছেন? ইন্টারেস্ট রেট কোথায় দিচ্ছেন? কে বলতে পারবে আপনি কী স্বচ্ছতা দিয়েছেন আমাকে। ওই স্বৈরাচারী সরকারের আমলে যে স্বচ্ছতার অভাব দেখেছি, সবাইকে আমাদের থামিয়ে দিয়েছেন। এখনো কাজটা আপনারা একই রকম করলেন। আপনারা কোনো স্বচ্ছতা দিলেন না।’

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘ওই পতিত সরকারের যে এডিপি ছিল, ওই এডিপি থেকে কেমন করে কমানো হলো। ওই মেগা প্রজেক্টগুলো যে অতিমূল্যায়িত ছিল, কোথায় টাকা কমিয়েছেন। আমি তো আবার মেগা প্রজেক্টের অল ইকুয়েশন দেখতে পারছি। আপনি ওখানে কীভাবে সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে কীভাবে নতুনভাবে স্থান দিলেন, কোনো নীতিমালা হলো না। এখন সেই আগের এডিপি এখন চলছে। আমি সেটার ভিত্তিতে কাজ করছি।

অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় বলেন, আমি আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি, যে বাজেট করতে যাচ্ছেন এই সরকার তো নিঃসন্দেহে বৈধ সরকার, তবে নির্বাচিত সরকার তো না। তার তো নিঃসন্দেহে সীমাবদ্ধতা থাকবে। এই সরকার তো পুরা বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে না। যদি আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে ফলো করি, তাহলে যারা পরবর্তী বাজেটে আসবে, তারা যে এটার ধারাবাহিকতা রাখবে, এটার নিশ্চয়তা কীভাবে রাখব। এত বড় আমার ইনভেস্টমেন্ট সামিট হয়ে গেছে। রাতের বেলা সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, তোমাদের নীতিকাঠামো কোথায়? আমি তো বলতে পারি নাই। এতগুলো সংস্কারের কর্মসূচি হয়েছে, এত সংস্কারের পথরেখা চান আপনারা। সবাই নির্বাচনের পথরেখা চায়, বিচারের পথরেখা চায়। আমি জিজ্ঞেস করি, আমার অর্থনীতির পথরেখা কোথায়? সরকার বদল হলেও প্রক্রিয়ার বদল হলো না।

আরও খবর পড়ুন:

আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি চায় ক্যাব যুব সংসদ

সমুদ্রসীমার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও উচ্চমাত্রার উদ্যোগ প্রয়োজন: মিডা চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ

ফোন আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমাল এনবিআর

মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিতে পারবে ৫০ কোটির প্রকল্প

শুল্কের কারণে আমদানি কমাচ্ছেন মার্কিন ক্রেতারা

সব রেকর্ড ভেঙে সোনার ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার

সংকট কাটাতে বাকিতে এলপিজি আমদানির সুযোগ

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর পুনঃস্থাপন

শীতার্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন অ্যাডভোকেট এলিনা খান

ভোটের আগে অর্থনীতিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রেখে যাচ্ছেন ড. ইউনূস