প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাজুবাদাম, গাড়ি, ট্রান্সফরমার, কপার টিউব, কপার তার এবং কোল্ড-রোল্ড কয়েলসহ আমদানিনির্ভর পণ্য, বিলাসপণ্য ও স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগী পণ্যে শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ঘোষণা দেন। ফলে এসব পণ্যের বাজারদর বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।
প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করতে গিয়ে সংসদে দেওয়া ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কর বৃদ্ধির মুখে পড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত ব্যক্তিগত গাড়ি। পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার উৎসাহিত করতে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলচালিত আমদানি করা গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এই ধরনের নতুন গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।’
মন্ত্রী জানান, দেশীয় কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কাজুবাদাম আমদানিতেও বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে আমদানিনির্ভর কাজুবাদামের বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৎস্য খাতেও নতুন কর আরোপের প্রস্তাব এসেছে। দেশীয় প্রক্রিয়াজাত মৎস্যশিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের বিভিন্ন হিমায়িত মাছের আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিতে বেশ কয়েকটি শিল্পপণ্যের ওপরও শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিপসাম বোর্ড ও শিট, পিভিসি রেজিন, পিইটি রেজিন, বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ (ফ্রি হুইল), ট্রান্সফরমার, কপার টিউব, কপার তার, কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট এবং পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার। এসব পণ্যের ওপর নতুন করে রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ বা বিদ্যমান আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে নির্মাণ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও কিছু উৎপাদন খাতের কাঁচামালের দাম বাড়তে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় শিল্পকে প্রতিরক্ষা দিতে হাউসহোল্ড টাইপ ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আমদানি করা ওয়াশিং মেশিনের দাম বাড়তে পারে। কাগজশিল্পের সুরক্ষায় গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পাশাপাশি ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে স্থানীয় মেইজ স্টার্চ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এ পণ্যের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নিকোটিন গ্র্যানিউলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানির ওপর নতুন করে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন। পাশাপাশি নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয় সংসদে। সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্যও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক-কর বৃদ্ধির বেশির ভাগ উদ্যোগের লক্ষ্য রাজস্ব বাড়ানো নয়; বরং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, আমদানি-নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা। তবে এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে কিছু আমদানিপণ্য ও ভোক্তাপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে কর কমানোর কারণে যেমন কিছু পণ্যের বাজারদর কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি শুল্ক ও কর বৃদ্ধির কারণে গাড়ি, কাজুবাদাম, কিছু নির্মাণসামগ্রী, আমদানি করা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি এবং তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরে কোন পণ্যের বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সেদিকে নজর থাকবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের।