হোম > অর্থনীতি

আয়ের খোঁজে ব্যয়ের নতুন বোঝা বাজেটে

শাহ আলম খান, ঢাকা 

বাজেট মানেই শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সুবিধা, দায় ও চাপের নতুন হিসাবও। সরকারের কাছে এটি উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ, রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা, ঘাটতি সামাল দেওয়ার কৌশল এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের রূপরেখা। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের অর্থ—বাজারে দাম বাড়া, ব্যবসায় বাড়তি ব্যয়, সংসারের খরচের নতুন হিসাব এবং দৈনন্দিন জীবনে নতুন চাপ।

এই প্রক্রিয়ায় কোথাও কর ছাড় দেওয়া হয়, কোথাও প্রণোদনা বাড়ানো হয়, আবার কোথাও নতুন কর বা ভ্যাট আরোপ করা হয়। কারণ সরকারের বাড়তি ব্যয়ের অর্থ শেষ পর্যন্ত জোগাড় করতে হয় রাজস্ব থেকেই। আর সেই রাজস্ব আসে বিদ্যমান অর্থনীতি থেকে, যার কারিগর সাধারণ মানুষ, ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোনো না কোনোভাবে বাজার, ব্যবসা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি স্পর্শ করে।

তাই বাজেটের অঙ্ক যত বড় হয়, তার প্রভাবও তত বিস্তৃত হয়। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেটও সেই চিরচেনা বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে সরকারের আয় বাড়ানোর এই প্রচেষ্টার চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায়, কার কাঁধে কতটা গিয়ে পড়বে।

১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট উপস্থাপন করবেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ—এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাজেটটি সাজানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি ভর্তুকি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়ানো, ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে এসব ব্যয় মেটাতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাজস্ব সংগ্রহ। কারণ অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ই এখন বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর আয়-ব্যয়ের হিসাবে মাঝখানে বাজেট ঘাটতি রাখা হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

বড় ব্যয়ের বাজেটে বড় রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা থাকাই স্বাভাবিক। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সেই বাস্তবতায় আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তাঁর মতে, বাজেটে যেসব খাতে ছাড় দেওয়া হবে, সেখানকার রাজস্ব ঘাটতি অন্য খাতে বাড়তি কর ও ভ্যাট আরোপ করেই পূরণ করতে হবে। এর বিকল্প বাস্তবে খুব সীমিত।

আর সেই কারণেই নতুন বাজেটে কর ও ভ্যাটের চাপ অর্থনীতির নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আভাস মিলছে। সেই চাপের প্রথম ধাক্কা পড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য পণ্যের বাজারে। প্লাস্টিকের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, হাইজেনিক ও টয়লেট সামগ্রীর ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে। নির্মাণ খাতের ভ্যাটও ৭.৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে বাড়তে পারে। ফলে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এতে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য থেকে শুরু করে বাড়িঘর নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজস্ব বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভ্যাট অব্যাহতির পরিধিও সংকুচিত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইন্টারনেট, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল ফোন, আসবাবপত্র, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি সীমিত বা প্রত্যাহার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

টেক্সটাইল খাতেও করের চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, সুতা ও ম্যান-মেইড ফাইবার ইয়ার্নে ভ্যাট বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান কর-সুবিধা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ১৫ শতাংশ করপোরেট কর সুবিধা ভোগ করা এ খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পোশাকসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামে পড়বে।

রাজস্ব বাড়ানোর আরেকটি বড় উদ্যোগ হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে কর কাঠামোর আওতায় আনা। জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার টোকেন ভ্যাট চালু, বিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং সরবরাহ পর্যায়ে ০.২০ শতাংশ উৎসে কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ৫০ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার চিন্তা করছে এনবিআর।

পরিবহন খাতেও বাড়তি করের প্রস্তুতি চলছে। ১৬৫ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ৫ হাজার টাকা এবং তার বেশি সিসির মোটরসাইকেলের জন্য ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ সিসির অন্যান্য যানবাহনকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্টিল খাতেও বাড়ছে করের চাপ। এমএস রড, বিলেট ও ইনগট উৎপাদনে সুনির্দিষ্ট কর প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে নির্মাণব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব আবাসন ও অবকাঠামো খাতেও পড়বে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অবশ্য বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই আগামী অর্থবছরের কর-ভ্যাট ও রাজস্বনীতি নির্ধারণ করা হবে।

যদিও সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরীর মতে, শুধু কর বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পাওয়া কঠিন। করের হার বাড়ানোর চেয়ে কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, নগদ অর্থের ব্যবহার কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হবে।

জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ১৫ টাকা কমল

সংকটের বাজেটে সংস্কারের ডাক

গোলটেবিলে তিতুমীর: সর্বস্তরে ভ্যাট ১৫% হলে দারিদ্র্য বাড়বে দেড় কোটি

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং চুক্তি স্বাক্ষর

প্রশাসকের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’, নগদের প্রতিবাদ

শেয়ারহোল্ডারদের সর্বসম্মত অনুমোদন: ওয়ালটন হাই-টেকের সঙ্গে ডিজি-টেকের একীভূতকরণ চূড়ান্ত পর্যায়ে

সোনার দাম কমল এবার ৫৪৮২ টাকা

বিএসইসিতে নতুন কমিশন: পুঁজিবাজার সংস্কারে ১০ কর্মসূচি

বাজেট ২০২৬-২৭: ভ্যাট রিটার্নে শেষ হচ্ছে মাসিক হিসাবের চাপ

৩৮ দিনে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৬৭৮ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ