ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ আগামী রোববার বার্ষিক বাজেট পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওপর ওপর দেখলে মনে হতে পারে, দেশটির অর্থনীতি বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।
চলতি অর্থবছর শেষে ভারত ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে রয়েছে। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চার ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে জাপানকে পেছনে ফেলে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ভারত।
মূল্যস্ফীতি এখন ২ শতাংশের নিচে এবং আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসগুলোতেও এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই থাকবে। দেশটির অর্ধেক মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি খাতের উৎপাদন বেশ শক্তিশালী। শস্য উৎপাদনও সন্তোষজনক এবং সরকারি শস্যভান্ডারগুলো এখন ভরপুর, যা গ্রামীণ আয় বাড়াতে সাহায্য করছে।
গত বছরের আয়কর হ্রাস এবং পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) বা ভোগ-শুল্ক যৌক্তিকীকরণের ফলে গ্রাহকদের চাহিদা বেড়েছে এবং ব্যয় করার প্রবণতা বৃদ্ধির দিকে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং নিম্ন মূল্যস্ফীতির এই সমন্বয়কে ‘গোল্ডিলকস’ পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ ডেভিড শুলম্যানের প্রবর্তিত এই শব্দ এমন এক অর্থনীতিকে বোঝায়, যা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে একদম সঠিক গতিতে এগোচ্ছে।
তবে ভারতের প্রবৃদ্ধির এই শক্তিশালী পরিসংখ্যানের আড়ালে কিছু গভীর চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে।
ভারত সরকার বলছে, বেকারত্ব কমছে, অথচ অস্থায়ী কাজের চাহিদা এখনো অনেক বেশি। দেশটির পাঁচটি বড় আইটি কোম্পানি, যারা কয়েক দশক ধরে প্রতি তিন মাসে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে তারা মাত্র ১৭ জন নতুন কর্মী নিয়োগ করেছে। শ্রমবাজারের দুর্বলতা বোঝার জন্য এই একটি লক্ষণই যথেষ্ট।
নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরিতে যে সফটওয়্যার খাত প্রধান ভূমিকা রেখেছিল, সেখানে নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হোয়াইট-কলার বা উচ্চপদস্থ কর্মীদের নিয়োগের এই মন্দার পাশাপাশি ভারতের শ্রমনিবিড় রপ্তানি খাতগুলোতেও সংকট অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কালো মেঘ জেঁকে বসেছে। এই অচলাবস্থা প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এ সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তিসহ (এফটিএ) বেশ কিছু চুক্তি করে বাজার বহুমুখীকরণের তৎপরতা দেখিয়েছে, তবুও রপ্তানির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এইচএসবিসি রিসার্চের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ভারতের রপ্তানি ক্রমান্বয়ে কমেছে, অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি বেড়েছে খুবই সামান্য।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলো সহায়ক হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্যান্য বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে ভারত ভিয়েতনাম বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে গুণমান, দাম ও সক্ষমতায় পাল্লা দিতে পারবে কি না, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে।
শুল্ক নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে থাকলেও অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি প্রবণতা নিয়ে চিন্তিত, যা ভারত দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কাটাতে পারছে না। আর তা হলো দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ।
জেপি মরগানের জাহাঙ্গীর আজিজ সম্প্রতি একটি পডকাস্টে বলেছেন, ২০১২ সাল থেকে ভারতে করপোরেট বিনিয়োগ থমকে আছে এবং তা জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশেই আটকে আছে। তাঁর প্রশ্ন, সরকার কেন জিজ্ঞেস করছে না, টানা ১৩ বছর ধরে করপোরেট ইন্ডিয়া কেন নতুন বিনিয়োগ করছে না?
আজিজের মতে, নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার কারণ হলো কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। কারণ, বাজারে চাহিদা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। চাহিদা না বাড়লে নতুন করে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
রকফেলার ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান রুচির শর্মার মতে, এই পরিস্থিতির সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা যুক্ত করলে বোঝা যায়, জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির আড়ালে অনেক দুর্বলতা ঢাকা পড়ে আছে।
সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে শর্মা বলেন, ভারত অনেক দিন ধরে বিদেশ থেকে খুব সামান্য পুঁজি আকর্ষণ করতে পেরেছে। এর প্রধান কারণ ‘লাইসেন্স রাজ’-এর দীর্ঘসূত্রতা; যার ফলে জমি অধিগ্রহণ বা কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
রুচির শর্মা বলেন, চীন ও ভিয়েতনামের মতো এশিয়ার যেসব দেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে, তাদের রমরমা সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভারতে এই হার কখনোই ১ দশমিক ৫ শতাংশ পার হয়নি এবং বর্তমানে তা মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।
অবশ্য নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, ভারত সরকার সম্প্রতি শ্রম আইন সংস্কার করেছে, যা তাদের মতে ব্যবসা করার পরিবেশ সহজ করবে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ ফেরানোর জন্য তা যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি