পিআরআইয়ের সেমিনার
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে এবং বাংলাদেশও সেই অস্থির পরিবেশের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ও বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। বর্তমানে বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য, আমদানি অর্থায়ন এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব ও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার বজায় রাখা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল রোববার রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব বিশ্লেষণ তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড যৌথভাবে ‘সামষ্টিক অর্থনীতি অন্তর্দৃষ্টি: বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং উত্তরণের পথ নিয়ে আলোচনা হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের ফলে নীতিনির্ধারণে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আর্থিক ও রাজস্ব ব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
সেমিনারে শিল্প খাতের বাস্তবতাও তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের অনেক তৈরি পোশাক কারখানা এখন মাত্র ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লোকসানের মুখে পড়ছে। রপ্তানির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে, যা আগামী কয়েক মাসও অব্যাহত থাকতে পারে। এই বাস্তবতায় রপ্তানি খাতকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে বিনিময় হার আরও নমনীয় করা এবং টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সত্তার বলেন, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে; যা বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সময়সীমা এক থেকে দুই বছর বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাণিজ্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জায়েদী সত্তার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ইস্যুর মুখোমুখি—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, জাপানের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৮ থেকে ১০ শতাংশ বাড়াতে হবে। তবে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বর্তমান গতিতে না-ও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমদানি অর্থায়নের প্রধান উৎস হয়ে উঠবে রপ্তানি আয়। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, নিম্ন মূল্যস্ফীতি, উন্নত লজিস্টিকস, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রাথমিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং সময়োপযোগী সংস্কার অব্যাহত রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) হ্যারি থম্পসন বলেন, সঠিক নীতি ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এই সংকটের মধ্যেও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।