ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত যশোরের গদখালী অঞ্চলে জারবেরা চাষ নির্ভরশীল ছিল ভারত থেকে আমদানি করা চারার ওপর। উচ্চমূল্য, মান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ পরিবহন সময়; সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ত, ঝুঁকিও থাকত। এই বাস্তবতায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) টিস্যু কালচারের মাধ্যমে রোগমুক্ত ও মানসম্মত জারবেরা চারা উৎপাদনে সফল হওয়ায় স্থানীয় ফুল অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের আধুনিক ল্যাবে উৎপাদিত এই চারা পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে রোপণ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন চাষিরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে শুধু গদখালী-পানিসারা-নাভারন এলাকায় বছরে কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় সম্ভব হবে, একই সঙ্গে কমবে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ।
যশোরে অন্তত অর্ধশতাধিক শেডে কাটফ্লাওয়ার হিসেবে জারবেরা চাষ হয়। বছরে প্রয়োজন হয় ৩০-৪০ হাজার চারা। এত দিন প্রতিটি চারা ভারত থেকে প্রায় ৭০ টাকায় কিনতে হতো। যবিপ্রবির ল্যাবে উৎপাদিত চারা ৩০-৩৫ টাকায় সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। অর্থাৎ চারার খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
ঝিকরগাছার পানিসারার ফুলচাষি মো. সাইফুল ইসলাম নিজের শেডে আমদানি করা চারার পাশাপাশি যবিপ্রবির চারা লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই বেডের গাছ দেখেই পার্থক্য বোঝা যায়। গাছ গাঢ় সবুজ, ফুলের রং উজ্জ্বল। ফলনও ভালো মনে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ভারত থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করা জারবেরা ফুলের চারার গুণগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে যবিপ্রবির টিস্যু কালচারে উৎপাদিত জারবেরার চারার দাম কম হওয়ায় একদিকে মানসম্মত ফুল উৎপাদন হবে, অন্যদিকে চারা আমদানি না করার কারণে ডলার বাঁচবে।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রহিমের ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে কম দামে চারা পেলে জারবেরা চাষ আরও বাড়বে। আমদানি বন্ধ হলে এই অঞ্চলেই বছরে কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় হবে।
যবিপ্রবির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, গদখালীতে প্রতিবছর ৩০-৪০ হাজার জারবেরা ফুলের চারা লাগে, যা ভারতের পুনে থেকে ফুলচাষিরা উচ্চমূল্যে এনে থাকেন। এতে করে লম্বা সময়ের কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ গবেষণার মাধ্যমে জারবেরার অণুচারা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘স্থানীয় শিল্প ও কৃষিতে অবদান রাখতে চায় যবিপ্রবি। সে বিষয়টি মাথায় রেখে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের টিস্যু কালচার গবেষণার ফসল হলো জারবেরার অণুচারা। ফুলের রাজধানী গদখালীতে জারবেরার চারার যে চাহিদা রয়েছে, সে পরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের ইচ্ছা আছে গদখালীতে একটি আধুনিক ল্যাব স্থাপন করে সেখানে জারবেরার অণুচারা তৈরির।’