ফাল্গুনের পড়ন্ত বিকেলে চারদিকে উৎসবের আমেজ। বটের গায়ে লাল-হলুদ শাড়ি, আর পাকুড় সেজেছে সাদা ধুতিতে। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ আর অতিথিদের উলুধ্বনিতে সম্পন্ন হলো এক ব্যতিক্রমী বিয়ে। প্রকৃতির দুই অকৃত্রিম বন্ধু বট ও পাকুড়গাছের এই বিয়ে দেখতে ঢল নেমেছিল উৎসুক জনতার।
গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের কিসমত পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে ধুমধাম করে এই ‘বৃক্ষবিবাহ’ সম্পন্ন হয়।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার বর্ণাঢ্য গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালীমন্দিরের পাশের পুকুরপাড়ে সাজানো হয়েছে বিয়ের মণ্ডপ। সেখানে আলপনা, ধান-দূর্বা, সিঁদুর আর মিষ্টির সমাহার। বরের সাজে পাকুড় আর কনের সাজে বটগাছকে ঘিরে চলছে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ। বেলা আড়াইটার দিকে সাত পাক ঘোরানোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বিয়ের মূল পর্ব। এরপর আমন্ত্রিত প্রায় ৪০০ পরিবারের অতিথিদের জন্য ছিল ভোজের ব্যবস্থা।
হিন্দুশাস্ত্রানুসারে বট ও পাকুড়কে ‘দেবতা বৃক্ষ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আয়োজকদের মতে, ব্যক্তির মোক্ষলাভ, অশুভশক্তির বিনাশ এবং প্রকৃতির মঙ্গল কামনায় এই প্রাচীন লোকাচার পালন করা হয়েছে।
চিলারং গ্রামের পরিমল চন্দ্র বর্মন (৫৫) বটের ‘পিতা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, চার বছর আগে বট ও তিন বছর আগে পাকুড় গাছটি তিনি রোপণ করেছিলেন।
বর পাকুড় গাছের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলরাম সরকার (৬০)। তিনি বলেন, ‘পরিবারের বড়দের পরামর্শে কোনো কমতি না রেখেই এই আয়োজন করেছি। এটি কেবল অনুষ্ঠান নয়, প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।’
ব্যতিক্রমী এই বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘বট-পাকুড়ের বিয়ের কথা লোকমুখে শুনেছি, কিন্তু নিজের চোখে দেখার সুযোগ হলো আজ। এটি সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।’
ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে এই আয়োজনকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল একটি ধর্মীয় লোকাচার নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে গাছের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা তৈরি হয়।’
পুরোহিত শুভন চক্রবর্তীর মতে, এই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে বৃক্ষপ্রেমী করে তোলা এবং প্রকৃতিকে বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করা।