পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, ইনসাফ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার এবং সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে বিজয় নিশ্চিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন টাঙ্গাইলের আটটি আসনের প্রার্থীরা। তবে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, টাঙ্গাইলের আটটি আসনের সব কটিতেই মূলত লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। তবে তাঁদের জয়-পরাজয়ে বাদ সাধতে পারেন স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
এদিকে ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোটাররা মুখে কুলুপ আঁটছেন। আগের মতো আর রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন না, আড্ডার মেজাজে তর্কে জড়াচ্ছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নীরব হয়ে যাওয়া এই ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন ভোটের ফল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৪, টাঙ্গাইল-৫ ও টাঙ্গাইল-৮ আসনের ভোটারদের মধ্যে অজানা দানা বেঁধেছে। আসনগুলোয় বিএনপি-জামায়াতের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করায় ভোটের মাঠে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইল-২, টাঙ্গাইল-৬ ও টাঙ্গাইল-৭ আসনে দ্বিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
টাঙ্গাইলের ৮টি আসনে ভোটের মাঠে রয়েছেন ৪৭ জন প্রার্থী। এই আসনগুলোয় মোট ভোটার ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ৬৩টি। জেলায় প্রবাসী ও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ৪০ হাজার ৯৩ জন।
টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে বিএনপির ফকির মাহবুব আনাম স্বপন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর ডা. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. হারুন অর রশিদ (হাতপাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম আজাদ (তালা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও তালার মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবদুস সালাম পিন্টু (ধানের শীষ), জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. হুমায়ুন কবীর (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির হুমায়ুন কবীর তালুকদার (লাঙ্গল) এবং ইসলামী আন্দোলনের মনোয়ার হোসেন সাগর (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়ে এগিয়ে পিন্টু ও হুমায়ুন।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম ওবায়দুল হক নাসির (ধানের শীষ), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাইফুল্লা হায়দার (শাপলাকলি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. রেজাউল করিম (হাতপাখা), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ (মোটরসাইকেল)
ও স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী আইনুন নাহার (হাঁস) মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে নাসির, আজাদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে অনেকের ধারণা।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে লুৎফর রহমান মতিন (ধানের শীষ), খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক (দাঁড়িপাল্লা), লিয়াকত আলী (লাঙ্গল), আলী আমজাদ হোসেন (হাতপাখা), হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (হাঁস) এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল হালিম মিঞা (মোটরসাইকেল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে সর্বোচ্চ আলোচনায় রয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী।
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলা সদরের এই আসন পেতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু চেষ্টা চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির আহসান হাবিব মাসুদ (দাঁড়িপাল্লা) প্রতীক নিয়ে বিজয়মালা অর্জনের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। এই দুইয়ের মাঝে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাসী টুকু বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ ভোটবঞ্চিত মানুষগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে আগ্রহী হয়ে আছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁরা গণতন্ত্রের উত্তরণ এবং সুখী সমৃদ্ধ সুন্দর চাঁদাবাজমুক্ত ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েমের জন্য ধানের শীষকে বিজয়ী করবেন।’
জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ বলেন, ‘ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েমের জন্য এবং জুলুম নির্যাতন চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশের জনগণ দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করবে।’
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফরহাদ বলেন, ‘আমি জনগণের ভালোবাসা ও ভিত্তির ওপর ভর করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কর্মীরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাবশালীদের চাপে অনেক ভোটার নীরব হয়ে যাচ্ছে। তবে কোনো বাধাই বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারবে না।’
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে ধানের শীষের রবিউল আওয়াল এবং দাঁড়িপাল্লার এ কে এম আব্দুল হামিদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে জনপ্রিয়তার দৌড়ে এগিয়ে থাকা ধানের শীষের আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে পেছনে ফেলে দাঁড়িপাল্লা মার্কার আব্দুল্লাহ ইবনে আবুল হোসেন জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে আছেন।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনে আহমেদ আযম খান (ধানের শীষ), শফিকুল ইসলাম খান (দাঁড়িপাল্লা), আওয়াল মাহমুদ (কোদাল), আলমগীর হোসেন (প্রজাপতি), নাজমুল হাসান (লাঙ্গল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে আযম খান, সালাউদ্দিন আলমগীর ও শফিকুল ইসলামের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ভোটারদের ধারণা।
টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ গ্রন্থাগারের সহসভাপতি খন্দকার নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করার জন্য ভোটাররা সুষ্ঠু ও সুন্দর নিরাপদ পরিবেশে কেন্দ্রে যেতে পারলে গণতান্ত্রিক ধারা পুনরায় ফিরে আসবে। টাঙ্গাইলের আটটি আসনের চিত্র বলছে, বেশির ভাগ আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আবার স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাবে ত্রিমুখী লড়াই হবে তিনের অধিক আসনে।’