সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধে মাটির কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি। অথচ এখনো অনেক বাঁধে মাটি ফেলা হচ্ছে। একাধিক হাওর ঘুরে কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে—এমন বাঁধ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাউবো ৭২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে দাবি করলেও হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন, বাস্তবে অর্ধেক কাজও হয়নি। মূলত অর্থসংকটের কারণে বাঁধের কাজ পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনের।
গত শুক্রবার দিনব্যাপী ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের চন্দ্র সোনারথাল, ধানকুনিয়া, সোনামড়ল, হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের অন্তত ৪০টি প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ অনেক ক্লোজারে (ভাঙন) কোনোরকমে মাটি পড়লেও নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে নেওয়া হয়নি টেকসই ব্যবস্থা। কোনো কোনো ক্লোজারের গোড়ায় বড় ধরনের ভাঙন ও ধসে পড়ার আলামত দেখা গেছে। অনেক কাজ বাকি থাকলেও পিআইসি-শ্রমিকের উপস্থিতি ছিল না অধিকাংশ প্রকল্পে।
সোনামড়ল হাওরের ৭০ ও ৭১ নম্বর পিআইসিসহ একাধিক বাঁধে এখনো মাটি ফেলা হচ্ছে। এই হাওরের সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের দিগজান গ্রামসংলগ্ন ৯২ ও ৯৩ নম্বর পিআইসিভুক্ত বাঁধের গোড়ায় বিপজ্জনক ভাঙনের দেখা মিলেছে। পিআইসির লোকজন কোনোরকমে মাটি ফেলে দায় সেরেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
দিগজান গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান চৌধুরী ও মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী জানান, বাঁধে মাটি দেওয়ার পরপরই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। মাটি ধসে পড়ে বাঁধ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিগত বছরের তুলনায় এই বাঁধে এবার মাটিও কম পড়েছে। সময় ফুরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হচ্ছে না। ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
সোনামড়ল হাওরের বাগবাড়ি-বিনোদপুরসংলগ্ন ৯০ নম্বর প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, পিআইসির সদস্যসচিব মো. সাগর শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এই বাঁধের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও বিল পেয়েছেন মাত্র ১৫ শতাংশের। শ্রমিকদের টাকা না দিলে কাজ কীভাবে হবে? একই প্রশ্ন ৭০ নম্বর পিআইসি-সংশ্লিষ্ট হোসেন আহমদ বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
এদিকে, চন্দ্র সোনারথাল হাওরের সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন অংশের ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর প্রকল্পে মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এই বাঁধের একটিতে দূর্বা-দুরমুশের কাজে শ্রমিকদের দেখা পেলেও বাকি বাঁধে কারও দেখা পাওয়া যায়নি। খাওনাই নদের দুই পারে বিস্তৃত চন্দ্র সোনারথাল ও ধানখুনিয়া হাওরের অধিকাংশ বাঁধের চিত্র একই রকম। অপরদিকে, জামালগঞ্জের হালি হাওরের ২ থেকে ১৮ নম্বর প্রকল্পভুক্ত এলাকার বেশ কয়েকটি বাঁধে এখনো মাটি পড়ছে। একসময়ের বিপজ্জনক ক্লোজার হিসেবে পরিচিত ১৭ ও ১৮ নম্বর পিআইসিভুক্ত ঘনিয়ার বিল অংশের নদীতীরবর্তী বাঁধের একাংশে ধস নেমেছে। নদীর বিপরীত পারে শনির হাওরের পুঁটিচুড়া বাঁধের গোড়ায় ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া শনির হাওরের সাহেবনগর গ্রামের পূর্ব দিকের ভয়ংকর ভাঙনটিতে মাটির কাজ প্রায় শতভাগ শেষ হলেও বাঁধ টেকসইকরণে বাঁশ-বস্তা ফেলার আলামত চোখে পড়েনি।
এ মুহূর্তে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি চরম প্রতিকূলতায় মোড় নেবে—এমন শঙ্কা কৃষকের। বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত হাওর আন্দোলনের নেতারাও। গত বুধবার সুনামগঞ্জ শহরে বাঁধ নির্মাণকাজে অনিয়ম, অবহেলা ও ধীরগতির অভিযোগ এনে মানববন্ধন করেছেন তাঁরা।
শাল্লা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, ‘এই উপজেলায় কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ। এ মুহূর্তে অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল নেমে এলে নিশ্চিতভাবেই হাওরবাসী বিপদের সম্মুখীন হবে।’
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সুনামগঞ্জের আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘বাঁধে যেনতেনভাবে যে কাজ হচ্ছে, তাতে দুর্যোগ নেমে এলে বিপদ নিশ্চিত। কৃষকের শ্রম-ঘাম রক্ষায় হাওরে পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১২টি উপজেলার ৪২টি হাওরে এ বছর ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের কাজ হচ্ছে। এ জন্য প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। জেলার ছোট-বড় ১৩৪টি হাওরে প্রতিবছর সোয়া দুই লাখ হেক্টরের মতো জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়। এসব হাওরে বেড়িবাঁধ আছে প্রায় ১ হাজার ৭১৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে এই বছর পাউবো বাঁধ নির্মাণ করছে ৪২টি হাওরে।
সুনামগঞ্জের হাওরে শনিবার পর্যন্ত ৭২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, অধিকাংশ বাঁধে মাটির কাজ শেষ। দূর্বা-দুরমুশের কাজ চলমান। এ কাজে এখন পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে ৪৭ কোটি টাকা।