শরীয়তপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিন সাংবাদিকের ওপর হামলা এবং পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি, নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি এবং দৈনিক এদিন-এর প্রতিনিধি বরকত উল্লাহ হামলার শিকার হন।
তাঁদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লাসহ কয়েকজন তাঁদের ওপর হামলা করেন। পরে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এইচআরএসএস মনে করে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, পেশাগত কাজে বাধা প্রদান, সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া বা ফুটেজ মুছে ফেলতে বাধ্য করা এবং ভয়ভীতি বা হুমকি প্রদান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নেতা-কর্মী সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশের কারণে শারীরিকভাবে আক্রমণ বা হুমকি দেওয়ার অধিকার রাখেন না।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা হুমকির ঘটনা ঘটলে তা শুধু ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না; বরং অন্যান্য সাংবাদিকের মধ্যেও ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের (self-censorship) পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
এইচআরএসএস আরও মনে করে, কোনো সাংবাদিকের সংবাদ বা প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিকারের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবাদলিপি, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ অথবা আইনগত প্রক্রিয়া। হামলা, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জবরদস্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে হবে দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস। তারা বলছে, তদন্তে হামলা, হুমকি, পেশাগত কাজে বাধা বা সাংবাদিকদের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। হামলার শিকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারকে শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।
এ ছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে তাদের নেতা-কর্মীদের সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এইচআরএসএস মনে করে, একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের কলমকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়া যায় না। সাংবাদিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সুরক্ষা দেওয়া নয়; বরং জনগণের জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে সুরক্ষা দেওয়া।