হোম > সারা দেশ > রংপুর

রংপুরে ৪ জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা, পচনের কারণে মুখ বীভৎস: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক

শিপুল ইসলাম, রংপুর 

নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। তাদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থ কোনো রাসায়নিক বা কেমিক্যাল বার্নের কারণে নয়; মরদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মুখের রং ও চেহারায় এমন পরিবর্তন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস।

আজ সোমবার বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে মোবাইল ফোনে বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘ডেডবডি যখন পচে ওঠে, তখন এক্সপোজড এরিয়াগুলো যেগুলো পোশাকের বাইরে থাকে, ওগুলো অনেক সময় একটু কালো দেখায়। ওটা ধারণা করা হইছে। ওটা কোনো ধরনের কেমিক্যাল বার্ন বা এরকম কোনো কিছু ছিল না।’

বাবলু কুমার বিশ্বাস আরও বলেন, ‘কালো দেখাচ্ছে এটা ঠিক। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ওটা বললাম যে, এটা ডিকম্পোজিশন প্রসেসে, মানে ব্লাড যখন পচে যেতে থাকে, তখন কালারগুলো আস্তে আস্তে এরকম হয়ে যায়। এটা জাস্ট একটা প্রসেস আরকি, পচনের একটা প্রসেস। সাধারণত মরে গেলে তাজা মানুষই দেখি, পচা মানুষ তো আর খুব বেশি দেখা যায় না। যে কারণে যে দেখেনি তার কাছে তো এরকমই মনে হবে। কিন্তু এমনি কোনো কেমিক্যাল বার্ন-টার্নের কোনো চিহ্ন সেখানে নাই।’

হত্যার বিষয়ে বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে এবং ওই যে মনে করেন যে, ধস্তাধস্তির বিভিন্ন জায়গায় হয়তো একটু আঘাত-টাঘাত আছে, এই। তা ছাড়া অন্য কিছু নাই।’

এর আগে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁদের মুখের কাছে তরল পদার্থ দেখতে পায় পুলিশ। নিহতদের মুখ ‘বীভৎস’ ছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ কারণে মরদেহে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

গতকাল রোববার বিকেলে আজকের পত্রিকাকে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেছিলেন, ‘নিহতদের মুখগুলো প্রাথমিক অবস্থায় বীভৎস ছিল। মুখের কাছে কিছু তরল পড়ে ছিল। তাতে আমরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছিলাম যে, কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে কি না। এটা ফরেনসিক করবেন যে ডাক্তার, তাঁকে আমরা বলেছি। তাদের বডিতে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে কি না। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে ফাইনালি এটা শিউর হতে পারব। শরীরে অন্য কোথায় ছিল না, শুধু সবার মুখগুলো বীভৎস ছিল।’

তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেছেন, মরদেহে কোনো কেমিক্যাল বার্নের চিহ্ন নেই। পচন প্রক্রিয়ায় রক্ত ও শরীরের টিস্যুর পরিবর্তনের কারণেই মুখ কালচে ও বীভৎস দেখিয়েছে।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম ও মেয়ে আগামীকে নিয়ে তাঁর সংসার। গত শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে তাঁদের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

শনিবার রাতে পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। গত শনিবার রাতেই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২-এ তাঁদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় গতকাল রোববার রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামির সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল রোববার থেকে রংপুর জেলা স্কুল, কারমাইকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা বিক্ষোভ করছেন।