হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে রাজশাহীতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা আলু বেচাকেনা ও উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু বের করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। এতে গত বুধবার থেকে জেলার হিমাগারগুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার সরকার কোল্ডস্টোরেজে গিয়ে আলু বের করার কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। একই চিত্র ছিল পাশের উত্তরা কোল্ডস্টোরেজেও। স্বাভাবিক সময়ে বেচাকেনা, লোড-আনলোড ও পরিবহনে সরগরম থাকা হিমাগার এলাকাগুলোতে এদিন ছিল স্থবিরতা।
আলুচাষিদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, হিমাগার ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর কারণে চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আলু বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ বলেন, ‘এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে মালিকপক্ষের সর্বোচ্চ খরচ হয় ১০০ টাকা। অথচ চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪৭৫ টাকা, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’
আহাদ আলী শাহ বলেন, অতীতেও হিমাগার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সে সময় দেশের পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন মহল তাঁদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টির সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি।
আহাদ আলী শাহ আরও বলেন, গত ১৯ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে তিন থেকে চারবার বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিট হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন ও বেচাকেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আলুচাষি মো. হারুন বলেন, ‘আমাদের একমাত্র দাবি, অবিলম্বে হিমাগারের ভাড়া কমাতে হবে। ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
হিমাগারে ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে তাঁরা বিভিন্ন হিমাগারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বলেও জানিয়েছেন মো. হারুন।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, হিমাগারের প্রকৃত পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সংরক্ষণ ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে গিয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজশাহী জেলায় ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। প্রতিদিন একটি হিমাগার থেকে গড়ে এক হাজার বস্তা আলু বের হয়। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ হাজার বস্তা আলু বাজারে সরবরাহ হওয়ার কথা। তবে চলমান কর্মসূচির কারণে সেই সরবরাহ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন বন্ধ থাকলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে আলুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে জেলা মার্কেটিং অফিসার সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘একটি ব্যবসায়ী সমিতি এই আন্দোলন করছে। তাঁরা সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম মূল্যে আলু সংরক্ষণ করতে চায়। এ বিষয়ে তারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। সরকার এখনো চলতি মৌসুমের জন্য আলু সংরক্ষণের মূল্য নির্ধারণ করেনি। ফলে এ বিষয়ে আমার কিছু বলার সুযোগ নেই।’
অন্যদিকে রাজশাহীর আসমা কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার আউলিয়া রাজিব ওয়াহিদ বলেন, গত বছর ভাড়া বৃদ্ধির পর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামলে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তাঁদের জন্য কিছু ছাড় দিয়ে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবারও তারা ভাড়া কমানোর দাবি করছে। এ কারণে তাঁরা আলু বের করছে না। তবে সব খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া যৌক্তিকভাবেই বৃদ্ধি করা হয়েছে।